সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান বণ্টন ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অনুদান বণ্টন নিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নাট্যচর্চা করে আসা নাট্যদল আরণ্যক পেয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা। এদিকে নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নের মুখে থাকা বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান পেয়েছে ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

এই অনুদান বণ্টনের নীতিমালা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাট্যজন, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও শিল্পীরা। তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় অর্থ বণ্টনে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। অনেক সক্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী সংগঠন নামমাত্র অনুদান পেয়েছে, আবার অনেক সংগঠন কোনো কারণ ছাড়াই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

আরণ্যক ও জাতীয় কবিতা পরিষদ ইতোমধ্যে অনুদান প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে। একাধিক সংগঠন বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জোরালো হয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, অনুদান বণ্টন নিয়ে তাদের কাছে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হবে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের শিল্পকলা শাখার প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার ১৯৪টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে মোট এক কোটি ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা পেয়েছে ১২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার পেয়েছে চার লাখ ১৯ হাজার টাকা। ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই) বাংলাদেশ ও রাধারমণ সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্র পেয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা করে।

দেশের প্রথম সারির নাট্যদলগুলোর একটি বড় অংশ পেয়েছে এক লাখ টাকারও কম অনুদান। দেশ নাটক, স্বপ্নদল, বাংলাদেশ থিয়েটার, নাট্যতীর্থসহ কয়েকটি দল পেয়েছে এক লাখ ১৯ হাজার টাকা করে। ঢাকা পদাতিকসহ কয়েকটি সংগঠনের ভাগে এসেছে ৫৯ হাজার টাকা। থিয়েটার আর্ট ইউনিট, জাগো আর্ট সেন্টারসহ ৩৭টি সংগঠন পেয়েছে ৬৯ হাজার টাকা করে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আরণ্যকসহ ৬২টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্য মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ।

১৯৭২ সাল থেকে নিয়মিত নাট্যচর্চা করে আসা আরণ্যক নাট্যদল এই অনুদান গ্রহণে অপারগতার কথা জানিয়ে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠাতা মামুনুর রশীদ ও প্রধান সম্পাদক হারুন রশীদ লিখেছেন, পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় নাট্য আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একটি দলকে নবীন সংগঠনের কাতারে ফেলে নামমাত্র অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা তাদের অবদানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

চিঠিতে আরণ্যক বলেছে, রাষ্ট্রীয় অনুদান কেবল অর্থ সহায়তা নয়। এটি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি রাষ্ট্রের মূল্যায়নেরও প্রতিফলন। তাই অনুদান প্রদানের নীতিমালা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও মানদণ্ড পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

নাট্যনির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘আরণ্যকের মতো একটি দল পেয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার টাকা। অথচ অনেক কার্যক্রমহীন দল লাখ টাকার বেশি অনুদান পেয়েছে। গত এক বছরে কোনো কার্যক্রম নেই– এমন অনেক দলও অনুদান পেয়েছে। তারা কীভাবে অনুদান পেল, সেটাই প্রশ্ন।’ শুধু কম অনুদান নয়, বরাদ্দ তালিকা থেকেই বাদ পড়েছে বহু সাংস্কৃতিক সংগঠন।
বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের অভিযোগ, তাদের সংগঠনসহ অন্তত ১৭টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে কোনো কারণ না জানিয়েই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট বলেন, ‘শুধু আমাদের নয়, সারাদেশে শতাধিক সংগঠন এবার অনুদান পায়নি বলে ধারণা করছি। কেন বাদ দেওয়া হলো, তার কোনো লিখিত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি।’

অনুদান না পাওয়া সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, মহাকাল নাট্যসম্প্রদায়, উঠোন, নৃত্যাঙ্গন, মিরপুর সাংস্কৃতিক একাডেমি, রংধনু শিল্পী সংঘ, স্বাত্বিক নাট্য সম্প্রদায়, কাব্য বর্ষণসহ আরও কয়েকটি সংগঠন।
নাট্যদল অনুস্বরের প্রধান মোহাম্মদ বারী বলেছেন, ছয় বছরে ১২টি নাটক মঞ্চস্থ করার পরও তাদের নাম অনুদান তালিকায় নেই। তিনি এই বরাদ্দকে অন্যায্য উল্লেখ করে তালিকা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

ঢাকার বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৪৪ বছরের পুরোনো সাহিত্য একাডেমিও এবার অনুদান পায়নি। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানকে দেওয়া ১২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার অনুদান নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

ফেডারেশানের সাবেক চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ গত ২৫ জুন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া চিঠিতে অভিযোগ করেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি পক্ষ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে বর্তমান নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই অবস্থায় সরকারি অনুদান গ্রহণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি অনুদান বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত এবং বরাদ্দ পুনর্মূল্যায়নেরও দাবি জানান।

এবারের অনুদান প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় কবিতা পরিষদও। সংগঠনটির সভাপতি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সুফিয়া কামাল, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, মহাদেব সাহা, ফয়েজ আহমদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে মাত্র ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হয়েছে, যা অবমাননাকর।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *