সচিবের ‘আত্মীয়’ জলিলুরের পোস্টিং বাণিজ্যে ও দুর্নীতির তেলেসমাতিতে বিপাকে বন বিভাগ

জলিলুরকে রেঞ্জ কার্যালয় পরিবর্তনেও ডিএফও’র অদৃশ্য অনীহা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

পার্বত্য জেলা বান্দরবানের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী নিধনের নেপথ্যে যে কজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ তালিকায় রয়েছেন ফরেস্টার এইচ.এম. জলিলুর রহমান। বান্দরবান বন বিভাগের সদর রেঞ্জে গত দুই বছর যাবত সহযোগী রেঞ্জ কর্মকর্তার অতিরিক্ত লোভনীয় দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বন বিভাগের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি রেঞ্জে পদায়নের মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর নির্ধারণ করা থাকলেও, জলিলুর রহমান ক্ষমতার সব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের এক সচিবের আত্মীয় পরিচয় এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ)-কে মোটা অঙ্কের নগদ টাকা ও নিয়মিত মাসোহারা প্রদানের মাধ্যমে তদবির করে তিনি এই ‘প্রাইজ পোস্টিং’ নিজের কব্জায় ধরে রেখেছেন। তার মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈধ ট্রানজিট পাসের (টিপি) আড়ালে অমিল কাঠের ট্রাকে অতিরিক্ত ও অবৈধ কাঠ বোঝাই করা। টিপিতে উল্লিখিত পরিমাপের বাইরে চম্পা, বৈলাম, গোদা, গুটগুটিয়ার মতো সরকারের কর্তন নিষিদ্ধ ও অত্যন্ত মূল্যবান বন্য কাঠ ট্রাকে ঢুকিয়ে পাচারে সরাসরি সহযোগিতা করছেন তিনি, যার অবৈধ লভ্যাংশের একটি বড় অংশ নিয়মিত ডিএফও ও এসিএফ-এর পকেটে পৌঁছায়।

শুধু তাই নয়, কাগজের হিসাবের সাথে মাঠের কাঠের গরমিল লুকাতে তিনি ভুয়া ‘ডি-ফরম’ দেখিয়ে নতুন করে টিপি ইস্যু করেন, যার ফলে টিপি, ডি-ফরম এবং ট্রাকে থাকা কাঠের পরিমাপের মধ্যে কোনো বাস্তব মিল থাকে না। বান্দরবান ও পাল্পউড ডিভিশনে আগে থেকেই ভুয়া টিপির যে চক্র সক্রিয় ছিল, জলিলের মতো দুর্নীতিবাজ বনকর্মীদের কারণে তা এখন আরও বেপরোয়া রূপ নিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব সুনির্দিষ্ট অপরাধ হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো অবৈধ সুবিধা পেয়ে তাকে আরও বেশি পরিমাণে কাঠের গাড়ি লোডিংয়ের লাভজনক দায়িত্বে পদায়ন করে পুরস্কৃত করছে।

আড়ালে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি মূল হোতাদের ছেড়ে দেন। এই ঘটনাটি নিয়ে সে সময় স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হলেও অদৃশ্য খুঁটির জোরে ফরেস্টার এইচ.এম. জলিলুর রহমান বরাবরের মতোই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আত্মীয়তার এই প্রভাব খাটানোর ইতিহাস তার চাকুরিজীবনের শুরু থেকেই; নিয়ম অনুযায়ী এক বছরের পোস্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও চাকুরির শুরুতে তিনি তদবিরের জোরে ঢাকা সংলগ্ন সোনারগাঁও চেক স্টেশনে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মূলত সেই প্রথম পোস্টিং থেকেই তার অবৈধ উপার্জনের যাত্রা শুরু হয়, যা বর্তমানে বান্দরবান বন বিভাগকে গ্রাস করে এক বিশাল দুর্নীতির মহীরুহে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চল রক্ষা এবং বন্যপ্রাণী পাচার রোধে এই চরম দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ উচ্চপর্যায়ের আশু তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *