আজিমপুর প্রকল্প কার স্বার্থে? পরিবেশ ধ্বংসকরে আজিমপুরে ৭৭৪ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে মরিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম, নেপথ্যে ঠিকাদারের সাথে গোপন চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির দক্ষিণাঞ্চলে পুরোনো ভবন ভেঙে ১১টি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১১-২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে প্রায় ৭৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার এ প্রকল্প সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে পরিবেশ, জনঘনত্ব ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারের জোন-সি এলাকায় ৯ দশমিক ২৬ একর জমির ওপর বিদ্যমান ৩২টি পুরোনো ভবন অপসারণ করে নতুন আবাসন কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এখানে মোট ১১টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবনে ৮৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে এক হাজার বর্গফুট। এছাড়া প্রায় ২১০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও পাঁচটি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হবে, যেখানে প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮০০ বর্গফুট। প্রকল্পের আওতায় একটি ছয়তলা সার্ভিস ভবন, ১৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের মাল্টিপারপাস ভবন, ছয়তলা মসজিদ, অভ্যন্তরীণ সড়ক, পার্কিং ব্যবস্থা, মাস্টার ড্রেন, ফায়ার প্রটেকশন ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র সাবস্টেশন, ৩৭টি লিফট ও ১৪টি জরুরি জেনারেটর স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

গাছ ও খোলা জায়গা নিয়ে শঙ্কা

সম্প্রতি সরেজমিনে আজিমপুর কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্প এলাকায় মাটি পরীক্ষার (সয়েল টেস্ট) কাজ শুরু হয়েছে।

এলাকাজুড়ে এখনও বিপুল সংখ্যক দেশীয় ও পুরোনো বৃক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে চাম্বল, ডেউয়া, তাল, কদম, রেইনট্রি, মেহগনি, জাম, কৃষ্ণচূড়া, আকাশমণি, আম, ডাব, কাঠবাদাম, অর্জুন, হরীতকী, সজনে, কড়ই, কাঁঠাল, বরই, পেয়ারা, চালতা, সুপারি, বেল, দেবদারু, পিপুল, পলাশ ও শিউলিসহ নানা প্রজাতির গাছ রয়েছে, যাদের অনেকগুলো রাজধানীতে এখন বিরল হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, নতুন ভবন নির্মাণের ফলে দুই হাজারেরও বেশি গাছ কাটা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাদের মতে, অধিকাংশ গাছ ভবনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় নতুন স্থাপনা নির্মাণের সময় সেগুলো রক্ষা করা কঠিন হবে। পাশাপাশি এলাকাটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ খেলার মাঠও আকারে ছোট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আগের প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে আজিমপুরে ১৭টি ২০ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের পর থেকেই এলাকায় জনসংখ্যার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফুটপাতের বড় অংশ দখল হয়ে বাজারে পরিণত হয়েছে এবং যানজট আজিমপুর ছাড়িয়ে নীলক্ষেত ও নিউমার্কেট পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, আবাসন বৃদ্ধি পেলেও সমানতালে বাড়েনি সড়ক, পার্ক, মাঠ কিংবা অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। ফলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিদ্যমান সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

পরিকল্পনাবিদদের আপত্তি

নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, আজিমপুরের জনঘনত্ব বহু আগেই সহনীয় সীমা অতিক্রম করেছে। তার মতে, সরকারি আবাসন সম্প্রসারণের

পাশাপাশি পার্ক, খেলার মাঠ, জলাশয় ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টো বিদ্যমান খোলা জায়গা ও সবুজ পরিবেশ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে নির্মিত ১৭টি বহুতল ভবনের ফলে যে জনচাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার অনুপাতে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক বা অন্যান্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। একই ধারা অব্যাহত থাকলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও বসবাসযোগ্যতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

‘নগরবাসীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাত’

স্থপতি ইকবাল হাবিবও প্রকল্পের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, বড় আকারের আবাসিক ভবন নির্মাণের ফলে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। অথচ এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রাকসমীক্ষার তথ্য জনসম্মুখে নেই।

তিনি বলেন, “শুধু ভবন নির্মাণ করলেই উন্নয়ন হয় না। সেই ভবনের কারণে সৃষ্ট জনসংখ্যা ও সেবার চাপ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত মাঠ, পার্ক, বাজার, উপাসনালয় ও অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামোরও প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় এটি নগরবাসীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে পরিণত হতে পারে।”

সরকারের অবস্থান

তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গাছ কাটার আশঙ্কা নাকচ করেছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা কোষ) আবুল বাকের মো. তৌহিদ বলেন, “গাছ কাটার কোনো পরিকল্পনা নেই। যেখানে পুরোনো ভবন রয়েছে, সেখানেই নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে। গাছ কাটা হলে সেটি অবশ্যই খারাপ হবে।”

সর্বিক বিষয় গনপূর্ত আজিমপুরের নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে, তার পক্ষ থেকে গনপূর্ত

আজিমপুরের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী তাওহীদ কামিয়াব যোগাযোগ করে জানান, বক্তব্য নিতে অফিসে আসতে হবে। আপনার কাছে যে সকল ডকুমেন্টস আছে সব নিয়ে এসে দেখাতে হবে। অভিযোগের বিষয় তার বক্তব্য সংক্রান্ত ডকুমেন্টস সহ বক্তব্য হটসএ্যাপ অথবা ইমেইল চাইলে দিতে তিনি অস্বীকার করেন।

গনপূর্ত আজিমপুরের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী তাওহীদ কামিয়াবের সাংবাদিকের সাথে এহেন আচারন, সরকারি চাকরি বিধিমালার পরিপন্থী।

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ

রাজধানীর অন্যতম সবুজ আবাসিক এলাকা আজিমপুর সরকারি কলোনিতে নতুন করে ১১টি বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগকে

ঘিরে পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দুই হাজারেরও বেশি গাছ কাটা পড়তে পারে এবং সংকুচিত হতে পারে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ খোলা জায়গা ও মাঠ।

এমন সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যখন দেশের পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সরকার সারা দেশে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বলছে। পরিবেশ সচেতন মহলের প্রশ্ন, একদিকে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সবুজায়নের উদ্যোগ, অন্যদিকে রাজধানীর বিদ্যমান সবুজ অঞ্চল উজাড়ের আশঙ্কা, এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় কোথায়?

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *