নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে ব্যাপক দুর্নীতি, বনভূমি ধ্বংস, অবৈধ গাছ পাচার, ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানার বিরুদ্ধে। একাধিক ভুক্তভোগী, বনজ পণ্য ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দক্ষিণ বন বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, যার ফলে বনসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং সরকারি সেবার স্বচ্ছতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের অধীন সাতকানিয়া, পাদুয়া, বাঁশখালী, দোহাজারী, খুরশিয়া ও আশপাশের বিভিন্ন রেঞ্জে কাঠ পরিবহনের অনুমতি, বনভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র, জব্দকৃত বনজ পণ্য ছাড় এবং অন্যান্য প্রশাসনিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘুষ না দিলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় এবং বিভিন্ন অজুহাতে আবেদনকারীদের হয়রানি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও অনেক আবেদন মাসের পর মাস নিষ্পত্তি হয় না। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত একটি চক্র এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এদিকে বনভূমি ধ্বংস ও অবৈধ গাছ পাচারের বিষয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দক্ষিণ বন বিভাগের বিভিন্ন সংরক্ষিত এলাকায় গত কয়েক বছরে বিপুল পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে এবং বনভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ উজাড় হয়ে গেছে। এসব কাঠ বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে পাচার করা হলেও সংশ্লিষ্ট
কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, পাচারকারীদের সঙ্গে কিছু বন কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগটিতে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। সুবিধাজনক কর্মস্থলে পদায়নের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ
লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অন্যদিকে দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রত্যন্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানে দীর্ঘমেয়াদি পদায়নের অভিযোগও রয়েছে।
সরকারি বনভূমি দখল এবং অবৈধভাবে প্লট আকারে জমি বিক্রির অভিযোগও উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, দক্ষিণ বন বিভাগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকায় সরকারি জমি দখল ও বিক্রির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে বন উন্নয়ন ও বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বন বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি, যেমন—বাগান সৃজন, বাগান পরিচর্যা, এনরিচমেন্ট প্ল্যান্টেশন, সামাজিক বনায়ন এবং ‘সুফল’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বাগান সৃজন দেখানো হলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। কোথাও কোথাও প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নার্সারি, বাঁশ, সার, গোবর, পলিব্যাগ, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন উপকরণ ক্রয়ে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। মাঠপর্যায়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে বহু বনায়ন কর্মসূচি কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিজীবনের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে জমি, ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও বলেন, বিভিন্ন সময় প্রধান বন সংরক্ষক কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর তদন্তের অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। তাদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে বনভূমি ধ্বংস, অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
পরিবেশবিদদের মতে, বনভূমি ধ্বংস অব্যাহত থাকলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইতোমধ্যে অনেক বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বন বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অভিযোগগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি।