নিজস্ব প্রতিবেদক :
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা কোটি কোটি টাকা কি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, নাকি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে? বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) ঘিরে সম্প্রতি ওঠা একাধিক অভিযোগ এমন প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।
স্থানীয় ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং প্রভাব খাটিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ থাকলেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের বিভিন্ন শিক্ষা অবকাঠামো প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম নিজেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রকল্প বাগিয়ে নেন এবং পরে তা কমিশনের বিনিময়ে অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে কারিগরি স্কুল ও কলেজ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ নিয়েও এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পটি গ্রহণের পর তা নির্দিষ্ট কমিশনের
বিনিময়ে অন্য ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
যদি এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তা সরকারি ক্রয়বিধি ও নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ
স্থানীয় ঠিকাদারদের একাধিক সূত্র জানায়, কোনো প্রকল্পে কাজ পেতে হলে শুরুতেই দিতে হয় মোটা অঙ্কের ‘এন্ট্রি ফি’। এরপর বিল উত্তোলনের সময়ও দিতে হয় ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন। কমিশন না দিলে ফাইল আটকে রাখা, মাপজোকের প্রতিবেদন বিলম্বিত করা কিংবা বিল অনুমোদনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে নিয়ম মেনে কাজ করলেও বিল পেতে হলে আলাদা খরচ আছে। কমিশন ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না।
যদিও এসব অভিযোগের
পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো নথি এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবে একাধিক ঠিকাদারের বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে।
৩৫ লাখ টাকার রহস্য
অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা একটি কথিত ৩৫ লাখ টাকার কমিশন তহবিলকে ঘিরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে, প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাকে কমিশন দেওয়ার জন্য সংগৃহীত ৩৫ লাখ টাকা কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের কাছে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে রাশেদ ওই অর্থ নিয়ে আত্মগোপনে গেলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থ উদ্ধারের জন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে রাশেদের পরিবারের সদস্যদের দপ্তরে আনা হয় এবং তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়।
পরে আইনি জটিলতার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্টরা সরে আসেন। তবে এ অভিযোগের স্বপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রশাসনিক নথি প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টি স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।
কাজ না করেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কিছু প্রকল্পে বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে বিল উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রকল্পের বাস্তব কাজ ও বিলের হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি রয়েছে।
এছাড়া ভুয়া বিল-ভাউচার এবং অতিরঞ্জিত ব্যয় প্রাক্কলনের মাধ্যমে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও
রয়েছে। প্রকল্পের শুরুতেই ব্যয় অনুমান অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে কমিশনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয় বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ঠিকাদারি কার্যক্রম?
স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, ৬ থেকে ৭ জন প্রভাবশালী ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বড় আকারের অধিকাংশ প্রকল্প তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে নতুন বা সাধারণ ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।
তাদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট প্রশাসনিক ছত্রচ্ছায়া পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার?
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে নিজের অবস্থান শক্তিশালী রাখার চেষ্টা করেছেন।
সূত্রগুলো দাবি করছে, অতীতে তিনি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে নিজেকে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের ভাষ্য, প্রশাসনিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
কী বলছেন সচেতন মহল?
বরিশালের নাগরিক সমাজ, স্থানীয় ঠিকাদ শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের মতে, শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে।
তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, ভুয়া বিল, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক দুর্নীর্তিই নয়, বরং শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার শামিল হবে।
জবাব দিতে অনীহা
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে
নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান শিক্ষা প্রকৌশলী মোঃ তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, কোন দুর্নীতি অনিয়মকে মেনে নেয়া হবেনা। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।