নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বহুল আলোচিত “বিদ্যমান বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প” এখন নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। শত শত কোটি টাকার এই প্রকল্পের টেন্ডার কার্যক্রম, দরপত্র আহ্বানের সময়সূচি, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ড. ইব্রাহিম খলিলের নিয়োগকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ।
প্রাপ্ত নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রকল্পটির আওতায় অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বিপুলসংখ্যক টেন্ডার আহ্বান ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়াছ। অভিযোগ রয়েছে, এই তড়িঘড়ি প্রক্রিয়ার ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ব্যাহত হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
দুই মাসে ২০০ কোটির বেশি টাকার টেন্ডার: উন্নয়ন নাকি ‘দ্রুত নিষ্পত্তির’ প্রতিযোগিতা
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ২০০ কোটিরও বেশি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক দরপত্র আহবান, মূল্যায়ন এবং অনুমোদনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়, যা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক চিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী প্রতিটি টেন্ডারের ক্ষেত্রে দরপত্র প্রস্তুতি, অংশগ্রহণ, মূল্যায়ন এবং যাচাই-বাছাইয়ের জন্য যথেষ্ট সময় নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগএই প্রকল্পে গতি ছিল বেশি, স্বচ্ছতা ছিল কম।
একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “একসঙ্গে এত বেশি টেন্ডার লাইভথাকলে সবগুলোতে অংশ নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। ফলে বড় ও প্রস্তুত কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়, অন্যরা প্রতিযোগিতা থেকেই ছিটকে পড়ে।”
ই-জিপি বন্ধ, দীর্ঘ ছুটি তবুও বাড়েনি সময়
অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দরপত্র জমাদানের সময় ই-জিপি (Electronic Government Procurement) সিস্টেম আপগ্রেডেশনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ ছিল। একই সময়ে ছিল সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক বন্ধ।
সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণকারীদের স্বার্থে দরপত্র জমাদানের সময়সীমা বাড়ানো হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পে তা করা হয়নি।
ফলে অনেক সম্ভাব্য দরদাতা প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত, ব্যাংক গ্যারান্টি সংগ্রহ এবং অনলাইনে দরপত্র দাখিলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রয় ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সকল অংশগ্রহণকারীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক। প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক কারণে যদি সেই সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, তবে সময় বৃদ্ধি করাই আন্তর্জাতিক ও জাতীয় উত্তম চর্চা।
‘টেন্ডার ঝড়’-এর আড়ালে সুবিধাভোগী চক্র
প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো, কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে পরিকল্পিতভাবে টেন্ডার কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিপুলসংখ্যক টেন্ডার একই সময়ে আহবান এবং সীমিত সময়সীমা নির্ধারণের ফলে সাধারণ ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত প্রতিযোগিতার বাইরে চলে যায়। এতে আগে থেকেই প্রস্তুত বা অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রাপ্ত কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে।
পিডি ড. ইব্রাহিম খলিলের নিয়োগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শর্ত মানা হয়নি
টেন্ডার বিতর্কের পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক ড. ইব্রাহিম খলিলের নিয়োগ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালকের ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট মোশতা ও শর্ত অনুসরণ করার কথা। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য,প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কমপক্ষে ছয় মাস আগে পর্যন্ত চাকরিতে বহাল থাকার সক্ষমতা;
প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্ব অভিজ্ঞতা;
সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা (Procurement) বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা; বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা।
আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে আরও একটি অভিযোগ আলোচিত হচ্ছে। অভিযোগটি হলো, প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত বা প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু টেন্ডার আহবান করাই যথেষ্ট নয়; মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও হতে হবে প্রশ্নাতীত।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকল্পটির সম্পূর্ণ টেন্ডার প্রক্রিয়া, ই-জিপি ডেটা, মূল্যায়ন নথি, অনুমোদন কার্যক্রম এবং পিডি নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে।
বীজ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের নামে বাস্তবেই কি উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়েছে, নাকি শত শত কোটি টাকার ক্রয় প্রক্রিয়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে প্রভাবশালী ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের এক অদৃশ্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলয়? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে কেবল একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে।
বিএডিসির বীজ আধুনিকীকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে, তিনি কোন মন্তব্য করেননি।