নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ পরিষ্কার ও বাছাইকরণ যন্ত্র ক্রয়ের কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। অভিযোগ খতিয়ে টেন্ডার মূল্যায়নের জন্য কৃষি মন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দপ্তরে অভিযোগও করেছে একটি ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) না মেনে এই টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ক্রয় প্রক্রিয়াটি পুনরায় যাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে অভিযোগপত্রে।
কৃষি মন্ত্রণালয় এমন একটি আবেদন পাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এই ধরনের একটি আবেদন বুধবার দপ্তরে এসেছে। আজই সেটি সচিব দেখেছেন। তবে বিষয়টি নথিতে এখনও ওঠেনি। দুয়েকদিনের মধ্যেই নথিতে উঠতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা মেসার্স হাওলাদার এন্টারপ্রাইজের প্যাডে কৃষিবিদ মতিউর রহমানের স্বাক্ষরিত অভিযোগপত্রে বলা হয়, ক্লিনার ও গ্রেডার মেশিন ক্রয়ের জন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দাখিলকৃত প্রতিষ্ঠানকে মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী ভুয়া ডকুমেন্ট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভূক্ত করার কথা। কিন্তু সেখানে প্রকল্পটির পরিচালকসহ কমিটির সদস্যরা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে টেন্ডার পাওয়ার যোগ্য বলে ‘ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’ নামীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, যে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশ (এনওএ) দেওয়া হয়েছে তা টেন্ডার শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সম্পূর্ণ নিয়ম বহির্ভূত। এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি একই প্রতিষ্ঠানকে ১১৭৮৭৭৬ নম্বর আইডি মাধ্যমে ২ কোটি ৩৫ টাকার মালামাল সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়। যেখানে এই ধরনের পণ্য সরবরাহের কোন সরকারি অভিজ্ঞতা ইসলাম এন্টারপ্রাইজ নামীয় প্রতিষ্ঠাটির নেই।
একের পর এক সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পিপিআর নীতিমালার কোনো তোয়াক্কা না করে প্রকল্প পরিচালকের অত্যন্ত কাছের লোক হিসেবে পরিচিত ফার্মকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায় ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।
প্রকল্পটির প্রধান কার্যালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এমন কিছু অনিয়মের খবর তারাও শুনেছেন। এরইমধ্যে কমিটির একজন সদস্য এই কমিটি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। নিজের নাম প্রত্যাহার করে আবেদনও করেছেন ওই সদস্য। প্রকল্প পরিচালক গণমাধ্যমকে এড়িয়ে থেকে অফিস করছেন বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি অবগত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিএডিসির চেয়ারম্যানের দপ্তরে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য প্রকল্পটির পরিচালককে ডেকেও পাঠানো হয়েছিল।
অভিযোগ ও টেন্ডার সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক ডকুমেন্টস থেকে জানা যায়, বিএডিসির ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট অব এক্সিস্টিং সিড প্রোডাকশন, প্রসেসিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ প্রকল্পের আওতায় দরপত্রের মাধ্যমে বীজ পরিষ্কার ও বাছাইকরণ করার মেশিন ‘ক্লিনার কাম গ্রেডার’ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। টেন্ডারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতার সনদ বাধ্যতামূলক রয়েছে। তবে ‘ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’ নামের যে প্রতিষ্ঠানকে টেন্ডারের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে তার দাখিলকৃত অভিজ্ঞতা সনদ সঠিক নয়, ভুয়া। যা টেন্ডারের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অভিযোগ অনুযায়ী এ ধরনের অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা থাকলেও উল্টো তাদের পক্ষেই কাজের অনুমোদন (নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড বা এনওএ) জারি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক এ অনুমোদন দেন।
এ বিষয়ে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ
বলেন, “অনেক কাগজই আসে প্রতিদিন। টেন্ডারের বিষয়েও আজ (বৃহস্পতিবার) একটি আবেদন নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
তার দপ্তরে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলেও মন্তব্য করেন কৃষি সচিব।
এ বিষয়ে মডার্নাইজেশন অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট অব এক্সিস্টিং সিড প্রোডাকশন, প্রসেসিং অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন প্রকল্পের পরিচালকের ইব্রাহীম খলিলের সঙ্গে দেশকাল নিউজ কথা বলার চেষ্টা করে। মোবাইলে কল করে এবং হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও কোনো রিপ্লাই পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার মতিঝিলের বিএডিসি কৃষি ভবনে তার দপ্তরে গিয়েও প্রকল্প পরিচালককে পাওয়া যায়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খান দেশকাল নিউজকে বলেন, “শুনেছি এমন একটি অভিযোগ এসেছে। আমার কাছে এখনও আবেদনটি আসেনি। আবেদনটি আমার কাছে এলে এ বিষয়ে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, যোগসাজশের মাধ্যমে ইসলাম এন্টারপ্রাইজকে প্রকল্পের সব টেন্ডারের প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য ও সেবা সরাবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইসলাম এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে প্রকল্পটির একজন কর্মকর্তার অংশীদারত্ব রয়েছে, যিনি টেন্ডার প্রক্রিয়া ও মূল্যায়ণ কমিটির সদস্য হিসেবেও রয়েছেন। বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা বেরিয়ে আসবে। তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।