লাইফস্টাইল :
৩০ বছর বয়সের পর অনেকেই শরীরের শক্তি কমে যাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা এবং আগের মতো ফিটনেস ধরে রাখতে না পারার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মেটাবলিজম বা খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে মন্থর হয়ে যাওয়া।
তবে এটি স্বাভাবিক একটি পরিবর্তন হলেও সঠিক জীবনযাপন অনুসরণ করলে মেটাবলিজম সক্রিয় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকা সম্ভব। ভারতের শালিমার বাগের ফোর্টিস হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. পবন কুমার গোয়ালের মতে, মেটাবলিজম ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
১. দিন শুরু করুন প্রোটিনসমৃদ্ধ সকালের খাবার দিয়ে
দিনের শুরুতে সুষম ও পুষ্টিকর নাশতা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিম, পনির, দুধ, অঙ্কুরিত শস্য, বাদাম এবং গ্রিক দইয়ের মতো খাবারে প্রচুর প্রোটিন থাকে। প্রোটিন হজম করতে শরীরকে কার্বোহাইড্রেট বা চর্বির তুলনায় বেশি শক্তি ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে অপ্রয়োজনীয় খাবার খাওয়ার প্রবণতাও কমে।
২. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
মেটাবলিজম সক্রিয় রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো নিয়মিত ব্যায়াম। বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনে অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট শরীরচর্চার পরামর্শ দেন।
এর মধ্যে থাকতে পারে—
- দ্রুত হাঁটা
- শক্তি বৃদ্ধির ব্যায়াম
- সাইকেল চালানো
- যোগব্যায়াম
- সাঁতার
এসব ব্যায়াম শরীরের পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করে। পেশি যত বেশি থাকবে, বিশ্রাম অবস্থাতেও শরীর তত বেশি ক্যালরি পোড়াবে।
৩. দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকা এড়িয়ে চলুন
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকলে শরীরের ক্যালরি পোড়ানোর হার কমে যায় এবং নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যারা ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাদের প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার উঠে কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে—
- অল্প সময়ের হাঁটা
- স্ট্রেচিং
- সিঁড়ি ব্যবহার
ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে থাকা।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীরের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেই পানির ভূমিকা রয়েছে। সামান্য পানিশূন্যতাও ক্লান্তি ও অবসাদ তৈরি করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান হজম প্রক্রিয়া, পুষ্টি পরিবহন এবং শরীরের শক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে।
৫. পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম নিশ্চিত করুন
মেটাবলিজম নিয়ে আলোচনায় ঘুমের গুরুত্ব প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম প্রয়োজন।
অপর্যাপ্ত ঘুম শরীরের এমন কিছু হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে—
- ক্ষুধা
- খাবারের চাহিদা
- শক্তি ব্যয়
- ওজন নিয়ন্ত্রণ
দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে ওজন বৃদ্ধি এবং মেটাবলিজমজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৬. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল নামের হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোন অতিরিক্ত ক্ষুধা, খাবারের প্রতি আকর্ষণ এবং ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- ধ্যান
- গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন
- নিয়মিত শরীরচর্চা
- পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানো
- পছন্দের শখ চর্চা
. প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন
মেটাবলিজম স্বাভাবিক রাখতে শরীরের প্রয়োজন বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই খাদ্যতালিকায় গুরুত্ব দিন—
- ফলমূল ও শাকসবজি
- পূর্ণ শস্যজাত খাবার
- চর্বিহীন প্রোটিন
- বাদাম ও বীজ
- স্বাস্থ্যকর চর্বি
অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, কোমল পানীয় এবং জাঙ্ক ফুড যতটা সম্ভব সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের সঙ্গে মেটাবলিজম কিছুটা ধীর হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে এটি যেন স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেজন্য প্রতিদিন পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান, ভালো ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
তাদের ভাষায়, সুস্থ মেটাবলিজমের রহস্য কোনো কঠোর ডায়েট বা দ্রুত ফল পাওয়ার কৌশলে নয়; বরং প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার চাবিকাঠি।