মনিরুলের অবৈধ সম্পদের পাহাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সরকারি চাকুরির নির্দিষ্ট স্কেলের বেতন দিয়ে ঢাকা শহরে একটি ফ্ল্যাট কেনাই যেখানে মধ্যবিত্তের আজীবনের স্বপ্ন, সেখানে সরকারি এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্জিত সম্পদের যে খতিয়ান সামনে এসেছে তা রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি চাকুরির বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আকাশচুম্বী স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে তাঁর নামে থাকা কোটি কোটি টাকার ফ্ল্যাট, জমি ও বাড়ি তাঁর বৈধ আয়ের উৎসকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
​অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত এবং ব্যয়বহুল এলাকাগুলোর অন্যতম ধানমন্ডিতে এই কর্মকর্তার রয়েছে এক বিশাল ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডের ৩১ নম্বর বাড়ির ৯/এ নম্বর ফ্ল্যাটে তিনি বর্তমানে পরিবারসহ রাজকীয়ভাবে বসবাস করছেন। প্রায় ৩০১৯ বর্গফুটের এই সুবিশাল ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৭ থেকে ৯ কোটি টাকা। একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয় দিয়ে এই ধরনের কোটি কোটি টাকার ফ্ল্যাটে বসবাস করা কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।

​ধানমন্ডির এই ফ্ল্যাটটিই মনিরুল ইসলামের একমাত্র আবাসন নয়। রাজধানীর কলাবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ২৬৭ নম্বর বাড়িতে তাঁর মালিকানাধীন আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ১৩৫৯ বর্গফুটের ৪/বি নম্বরের এই ফ্ল্যাটটি দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া দেওয়া থাকলেও বিগত তিন মাস ধরে এটি খালি পড়ে রয়েছে। বহুতল ভবনটির প্রধান প্রবেশদ্বারে ঝুলতে থাকা ভাড়ার বিজ্ঞপ্তিতে খোদ এই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর দেওয়া রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কলাবাগানের এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা।

​ঢাকার আরেকটি জনবহুল এলাকা মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়েও এই কর্মকর্তার সম্পদের বিস্তৃতি রয়েছে। সেখানকার ৭ নম্বর রোডের ৫৫ নম্বর প্লটের সাড়ে ৪ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ২০টি টিনশেড ঘর। এই বিশাল টিনশেড বস্তি থেকে প্রতি মাসে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভাড়া বাবদ আসে, তা দেখভাল করার জন্য মনিরুল ইসলাম তাঁর একজন সাবেক ব্যক্তিগত গাড়িচালককে নিয়োজিত করেছিলেন। ওই চালক সপরিবারে সেখানে থেকে পুরো সম্পত্তি তদারকি ও ভাড়া তোলার কাজ করতেন।

​রাজধানীর এই বিশাল স্থাবর সম্পত্তির বাইরেও নিজ জেলা বরগুনায় মনিরুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন জমির সাম্রাজ্য। জেলার রায়হানপুর থানাধীন মাদারতলি মৌজায় পৃথক পৃথক দাগে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও সম্পত্তি ক্রয় করেছেন এই কর্মকর্তা। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মাদারতলি মৌজায় ২০.৭৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১০৯.৩৩ শতাংশ, ৬১.৭৫ শতাংশ, ৫২.৫০ শতাংশ এবং ১৩.১২ শতাংশসহ মোট বিশাল অংকের জমি নিজের একক নামে রেজিস্ট্রি করেছেন তিনি। গ্রামীণ অঞ্চলের এই শত শত শতাংশ জমির বর্তমান বাজারমূল্যও কোটি টাকার উপরে।

​অভিযোগের তীব্রতা অনুধাবন করে এই বিপুল সম্পদের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অসংখ্যবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর কর্মস্থলে সরাসরি গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি অফিস সহকারীর মাধ্যমে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী মারিয়া খানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরপরই রং নাম্বার বলে কলটি কেটে দেন। ফলে এই রাজকীয় সম্পদের ব্যাপারে তাঁদের কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *