তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে বার্ষিক ২৫০ কোটির ঘুষ বাণিজ্য: নেপথ্যে ৪২ ‘কোটিপতি’ উমেদার

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চাকরি নেই, সরকারি কোনো বেতন নেই, এমনকি বসার জন্য অফিসে একটা নিজস্ব চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত নেই। অথচ তাদের চোখের ইশারায় উঠবস করেন সাব-রেজিস্ট্রাররা। তাদের সবুজ সংকেত মিললে মুহূর্তেই হয়ে যায় অনেক অসাধ্য সাধন, আর টাকা না মিললে দলিলের দাঁড়ি-কমা কিংবা নামের বানানে সামান্য ‘মো.’ থাকা না-থাকা নিয়ে খোঁড়া অজুহাতে আটকে যায় সাধারণ মানুষের ফাইল। ঢাকা তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের ১১টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘উমেদার’ নামের এই চেয়ার-টেবিলহীন চরিত্রগুলোই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই ১১টি অফিসে নানামুখী দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়। মাসে যার পরিমাণ ২০ থেকে ২২ কোটি এবং বছরে তা দাঁড়ায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকায়। এই বিপুল পরিমাণ ঘুষের এক টাকাও সাব-রেজিস্ট্রাররা সরাসরি নিজেদের হাতে নেন না; পুরো প্রক্রিয়ার ক্যাশিয়ার ও তদারককারী হিসেবে কাজ করে সাব-রেজিস্ট্রারদের মনোনীত এই ‘উমেদার’ চক্র।

উমেদার: মুঘল আমলের ‘প্রত্যাশী’ থেকে বর্তমানের ‘ঘুষ সংগ্রাহক’

ফারসি শব্দ ‘উমেদার’-এর অর্থ চাকরি-প্রত্যাশী ব্যক্তি। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ‘উমেদার ফাইল’ চালুর মাধ্যমে এদের রাখা হতো। পাকিস্তান আমলে সেই ফাইল উধাও হলেও বর্তমানে তারা সাব-রেজিস্ট্রারদের প্রধান তল্পিবাহক ও ঘুষ সংগ্রহের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

কিছুদিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালিয়ে কোটিপতি উমেদারদের একটি তালিকা প্রকাশ করলেও রহস্যজনকভাবে সেই ফাইল গায়েব হয়ে যায়। তবে সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন -এর হাতে এসেছে, যেখানে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের দুর্নীতি ও জালিয়াতির ফিরিস্তিসহ ৪২ জন কোটিপতি উমেদারের সুনির্দিষ্ট তালিকা রয়েছে। এই অবৈধ টাকায় উমেদাররা খিলগাঁও, তেজগাঁও, বনশ্রী, রামপুরা ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক বনে গেছেন।

কোন অফিসে কার রাজত্ব?

১. মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস (ভূমি বিরোধ ও উমেদার ‘যুদ্ধ’)

মোহাম্মদপুর অফিসে উমেদার পদ নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। প্রবীণ উমেদার আবদুস সোবহানকে মিথ্যা মামলায় জেলে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে আরেক উমেদার আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। আওলাদ সরকারি তালিকাভুক্ত নকলনবিশ হলেও চাঁদাবাজি ও মাদকের মামলা মাথায় নিয়ে উমেদারি করছেন। আরেক উমেদার বাবু হাওলাদার কে অফিসে আসতে দিচ্ছে না বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ নেতাদের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করা আওলাদ এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে চলছেন। তার প্রধান দুই সহযোগী আকিব ও এনামুলের মাধ্যমে জিম্মি এই অফিস। আর সাব-রেজিস্ট্রার আবদুল কাদির ও অফিস সহকারী মো. হারিস এখানে নীরব দর্শক।

২. খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস (মন্ত্রী-আশীর্বাদপুষ্ট চক্র)

সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের আশীর্বাদপুষ্ট এক সাব-রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে এখানে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দৈনিক ১০

থেকে ১২ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের এই টেবিলের মূল ক্যাশিয়ার উমেদার মেহেদী ও শাহিন। খাসকামরা ও রেকর্ডরুমে প্রকাশ্যেই চলে তাদের ঘুষ গ্রহণ। উমেদার মেহেদী বর্তমানে কোটিপতি, যার ঢাকায় একাধিক প্লট ও গ্রামের বাড়িতে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। শাহীনের রয়েছে আবাসন কোম্পানিতে অংশীদারত্ব।

৩. ঢাকা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস (প্রক্সি সাব-রেজিস্ট্রার লোকমান)

এখানে সাব-রেজিস্ট্রার নেওয়াজ এজলাসে বসলেও পাশে দাঁড়িয়ে ইশারা দেন উমেদার লোকমান। ফাইল আটকে গেলে লোকমান নিজেই দাতা-গ্রহীতাকে নিয়ে খাসকামরায় ঢুকে ঘুষ রফাদফা করেন। কয়েক বছর আগে মানুষের কাছে হাত পেতে চলা লোকমান এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। খিলগাঁও, রামপুরা ও গাজীপুরের মীরের বাজারে রয়েছে তার অঢেল সম্পত্তি।

৪. উত্তরা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস (ঘুষের টেবিল দখলের লড়াই)

সাবেক নিয়ন্ত্রক উমেদার মনজু কোটি টাকা কামিয়ে এখন বড় ডিলার। তার সাথে ঘুষের একটি

দিক সামলান মহিউদ্দিন মানিক, যিনি ময়মনসিংহে ইউপি নির্বাচনেই ৫০-৬০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। আরেকটি টেবিল নিয়ন্ত্রণ করেন সাগর। তবে বর্তমানে ফিরোজ নামের এক উমেদার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পুরনোদের তাড়িয়ে একক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

৫. পল্লবী ও ধানমন্ডি (হাই-ভোল্টেজ ও অভিজাত ঘুষ)

পল্লবী অফিসের উমেদার জসিম দুদকের মামলার আসামি হয়েও বহাল তবিয়তে ঘুষের রাজত্ব চালাচ্ছেন। সম্প্রতি হালনাগাদ খাজনা-খারিজ ছাড়াই একটি দলিল রেজিস্ট্রি করে তিনি ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন, যার সমস্ত নথি ‘দৈনিক এদিন’-এর কাছে সংরক্ষিত। অন্যদিকে, ধানমন্ডিতে দলিলের সংখ্যা কম হলেও কোটি কোটি টাকার প্লট-ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির কারণে ‘বাম্পার ঘুষ’ আদায় করেন উমেদার রানা ও আশিক। মন প্রফুল্ল করতে এই উমেদাররা প্রায়ই দুবাই বা মালয়েশিয়ায় উড়াল দেন।

৬. বাড্ডা ও গুলশান (নূরানী দর্শন ও বিলাসী জীবন)

বাড্ডা অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমের দিনে ১০-১২ লাখ টাকা ঘুষ চাই-ই চাই।

তার হয়ে ক্যাশ তদারকি করেন ‘নূরানী দর্শন’-এর উমেদার টুটুল। অফিসে বসার চেয়ার না থাকলেও টুটুল চলেন নিজস্ব টয়োটা গাড়িতে। দেশের সবচেয়ে অভিজাত গুলশান অফিসে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টার্গেট করে কোটিপতি বনে গেছেন উমেদার সোহেল।

প্রবীণ দলিল লেখক আলী হোসেন মাতবর বলেন “ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের কর্ণধার এখন চেয়ার-টেবিলহীন উমেদাররা। নির্দিষ্ট হারে উমেদারের হাতে ঘুষ তুলে দিলে তবেই দলিল রেজিস্ট্রি হয়, এতে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে। জেলা রেজিস্ট্রার দপ্তরে বসে গল্প-গুজব করে সময় কাটান, কোনো ব্যবস্থা নেন না।”ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ কবির বলেন “সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সব অপরাধের গোড়া এই উমেদার চক্র। এদের কোনো সরকারি জবাবদিহিতা বা চাকরি হারানোর ভয় নেই। আইন অনু এজলাসের সামনে যাওয়ার অধিকার না থাকলেও

এরা খাসকামরা ও রেকর্ড রুমে রাজত্ব করে। সাব-রেজিস্ট্রার যখন এজলাসে মগ্ন থাকেন, উমেদাররা তখন খাসকামরায় ঘুষ লেনদেন করে ব্যাগ ভর্তি টাকা সাব-রেজিস্ট্রারের বাসায় পৌঁছে দেয়।”

উমেদারদের এই দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে একাধিক নাম প্রকাশ না করার কর্মকর্তা শর্তে বলেন,”আইজিআর আব্দুল মান্নান বেআইনিভাবে এদের নিয়োগ দিলেও আসলে সেগুলো ‘কলাপাতা’ নিয়োগ, যার কোনো বিধিমালা নেই। অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিই। তবে লোকবল সংকটের কারণে এদের পুরোপুরি সরানো যাচ্ছে না এবং কোনো কোনো সাব-রেজিস্ট্রারের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই এরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।”

উমেদাররা এখন এই দপ্তরের জন্য ‘বিষফোঁড়া’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা জানান, এর আগে দুদকের ৩৮ জন কোটিপতি উমেদারের তালিকা নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার অহিদুল ইসলাম নিজেই দুদকের মামলায় বরখাস্ত হন। বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থার ৪২ জনের নতুন তালিকাটি নিয়ে তারা ইমেজ সংকটে ভুগছেন

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *