শিক্ষা খাতকে ডুবিয়ে এক সোহেলই গড়েছেন অগুনতি অবৈধ সম্পদ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে ঘুস, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক পদে পদায়ন পান এই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, মাধ্যমিক উইংয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকে রিজেক্ট হওয়া শত শত ফাইল টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা, তদন্ত ছাড়াই এমপিও স্থগিত বা পুনর্বহাল, ভুয়া তদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। কেবল মাধ্যমিক শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালেই তিনি প্রায় ৫১ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরবর্তীতে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর তার এই সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি আরও প্রসারিত হয়।

বাড্ডায় কোটি কোটি টাকার জমি ও সাড়ে সাত তলা প্রাসাদ: রাজধানীর বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের অদূরে পূর্ব বাড্ডার কৃষি ব্যাংক রোড, পোস্ট অফিস গলিতে (১৮৩১ নম্বর হোল্ডিং) প্রফেসর সোহেলের সুবিশাল সাড়ে সাত তলা বাড়ি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গুলশান থানার বাড্ডা মৌজার ৩৪৯৬২ নম্বর খতিয়ান ও ১৭২১২ নম্বর দাগে নিবন্ধিত এই জমির দলিলে মালিক হিসেবে তার নাম রয়েছে। বর্তমানে উন্নতমানের মার্বেল পাথর ও ফিনিশিংয়ের কাজ চলা এই বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ১২ কোটি টাকা। এছাড়া একই মৌজার ৩৯৫ ৯০ নম্বর খতিয়ানের ১৬৭৫ত নম্বর দাগে তার মালিকানায় রয়েছে আরও ৬ কাঠা জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মতে, বিগত সরকারের আমলে গোপনে আঁতাত ও স্কাউটিংয়ের বাহানায় অর্থ কামিয়ে তিনি জমিটি কিনেছিলেন, যা মাউশিতে পদায়নের পর অট্টালিকায় রূপ নিয়েছে।

কক্সবাজারে ফ্ল্যাট ও মেরিন ড্রাইভে প্লট: মহাপরিচালকের পদে আসীন হওয়ার পর কক্সবাজারের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা ভিআইপি রোডের ‘পূর্বিতা সুলতানা ভিলা’ নামের ১২ তলা ভবনে ১৭৫০ বর্গফুটের একটি আলিশান ফ্ল্যাট কেনেন ড. সোহেল। কক্সবাজার জেলা শিক্ষা অফিসারের মধ্যস্থতায় কেনা এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য ২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এখানেই শেষ নয়, সমুদ্রঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ স্কয়ারে ভবিষ্যতে রিসোর্ট করার পরিকল্পনায় তার অন্তত ২০ কোটি টাকা মূল্যের প্লট রয়েছে বলেও জানা গেছে।

বিদেশে পাচার ও গাজীপুরে রিসোর্ট: অনুসন্ধানে ও তার একাধিক ঘনিষ্ঠ সহচরের সূত্রে জানা যায়, দেশে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি বিদেশেও বিপুল সম্পদ গড়েছেন মাউশি ডিজি। গাজীপুরে নিজস্ব রিসোর্ট ছাড়াও দুবাইয়ে তার ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট এবং কানাডায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে তিনি কানাডায় পাড়ি জমাতে পারেন বলেও তার ঘনিষ্ঠজনেরা আভাস দিয়েছেন। শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড. সোহেলের প্রকৃত সম্পদের যে হিসাব জানা গেছে তা অত্যন্ত সামান্য। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), এনবিআর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে তার ও তার পরিবারের সদস্যদের নামের সম্পদের অনুসন্ধান চালালে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।

রাজনৈতিক পালাবদলেও বহাল তবিয়তে সুবিধা গ্রহণ: ১৯৯৬ সালের ১৩ আগস্ট ১৬তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রাণীবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে কবিরহাট সরকারি কলেজে যোগ দেন সোহেল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে तत्कालीन শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হন। সেখানে মাত্র দুই মাসের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে পদায়ন বাগিয়ে নেন। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে কৌশল বদলে লিয়াজোঁ অব্যাহত রাখেন। আওয়ামী সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে মাউশির বিভিন্ন ডিজিদের সাথে সম্পর্কের মধ্যস্থতা করতেন তার বর্তমান পিএ ফরহাদ হোসেন। বিএনপি-পন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় থাকলেও আওয়ামী জমানায় স্কাউটের বাহানায় আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতসহ অন্তত ১১টি দেশ সরকারি খরচে ভ্রমণ করেছেন তিনি এবং তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে বাগিয়ে নিয়েছেন ৮টি পুরষ্কার। পটপরিবর্তনের পর তিনি পদোন্নতি ও অতিরিক্ত দায়িত্বের মাধ্যমে মাউশির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা ক্যাডারে বদলি বাণিজ্য ও ক্ষোভ: শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম থেকে ৩০তম বিসিএসের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, মাউশিতে এমন কোনো বদলি নেই যা ডিজি সোহেলের নির্দেশনা ও টাকার লেনদেন ছাড়া সম্ভব হতো। শিক্ষা ক্যাডারে বদলির জন্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করলেও সেখান থেকে ড. সোহেলের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্র যখন জাতীয় স্বার্থে অর্থ সাশ্রয়ের নীতি অনুসরণ করছে এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, তখন শিক্ষার অভিভাবক সংস্থা মাউশি-প্রধানের এমন শত কোটি টাকার দুর্নীতির উত্থানে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে অবিলম্বে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *