নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত নিরাময়ের উদ্দেশ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমের আড়ালে এক নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটপাটের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই তড়িঘড়ি করে অনুমোদিত ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন’ প্রকল্পটি বর্তমানে ব্যাপক দুর্নীতির এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই খাতের অনিয়মের এক ভয়ংকর চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে।
স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক স্থানে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে কাগজে-কলমে দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিল তুলে নিয়ে উধাও হয়ে গেছে, যদিও বাস্তবে নির্ধারিত কাজের অর্ধেকও সম্পন্ন হয়নি। আবার কোথাও কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজের গাইডওয়াল কিংবা সড়কের প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল নির্মাণকাজ সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ডিপিপির শর্ত উপেক্ষা করে পিরোজপুর ও বরিশাল অঞ্চলে অননুমোদিতভাবে প্রায় ৩২২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের নজিরও পাওয়া গেছে। এই প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে মামলা দায়ের করেছে।
বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ২০২০ সালে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। সরকারের প্রচলিত পরিকল্পনা নীতিমালা অনুযায়ী ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের যেকোনো নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই বা সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক হলেও এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণকাজে দলীয় ঠিকাদারদের অনৈতিকভাবে প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রকল্পের কাজ পরিদর্শনে গিয়ে এসব অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মান্দুরা বাজার থেকে ভরতখালী পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে মাত্র আধা কিলোমিটার কাজ করেই ৫২ লাখ টাকার সম্পূর্ণ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে মোট ৫ হাজার ৯০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই খাতের বিপরীতে ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৬১ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে, যার মধ্যে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে চলা এই বিপুল আর্থিক ব্যয়ের বিপরীতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে আসার পরও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের আট বিভাগের ৫৫ জেলার ৩৫৫টি উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অনেক এলাকায় কার্পেটিং স্তরে প্রাক্কলিত পরিমাপের চেয়ে অত্যন্ত পাতলা এবং নিম্নমানের ইটের খোয়া ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। রোলার বা ভাইব্রেটর দিয়ে যথাযথভাবে কম্প্যাকশন না করার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার উপরিভাগের সিলকোট ও কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। এর ফলে রাস্তা পুনর্নির্মাণের অল্প কিছুদিন পরেই বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিটুমিন ধসে পড়ছে। অথচ প্রকল্পের চুক্তিভিত্তিক শর্ত অনুযায়ী, পুনর্নির্মিত সড়ক ও সেতুগুলোর কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর ন্যূনতম তিন বছর পর্যন্ত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নির্ধারিত মেয়াদের অনেক আগেই অবকাঠামোতে ভাঙন দেখা দিচ্ছে।
অডিট পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে যে, ১৪টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছে এবং ২২ শতাংশ স্কিমের বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রকল্পটি গৃহীত হওয়ায় কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি, যার ফলশ্রুতিতে বাস্তবায়নে মারাত্মক বিলম্ব ঘটেছে। বর্তমানে ৪৮৮টি স্কিমের কাজ এখনো শুরুই করা যায়নি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের কালভার্ট ও সড়ক রয়েছে। এ ছাড়া চলমান শত শত স্কিমের বিভিন্ন স্তরের কাজ আংশিক সম্পন্ন হয়ে পড়ে আছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কাজ শেষ না হলে পুরো প্রকল্পটির সমাপ্তি নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে অর্থছাড় ও ব্যয়ের ধীরগতি, বাস্তবায়নকালীন দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির সভা নিয়মিত না হওয়ার বিষয়গুলোকে ব্যবস্থাপনাগত বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২০ সালের ২০ মে সংঘটিত ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে রাস্তাঘাট ও কালভার্টের যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, তা মেরামতের দায়িত্ব পেয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি। ধাপে ধাপে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি পেলেও মাঠপর্যায়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সড়ক ও কালভার্ট পুনর্বাসনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে কালভার্ট নির্মাণকাজে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে খুবই সামান্য অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, যা সামগ্রিক ভৌতিক অগ্রগতির তুলনায় অত্যন্ত হতাশাজনক। পুরো প্রকল্পটি সরকারের নিজস্ব তহবিল বা জিওবির অর্থে পরিচালিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় স্থানে সেতু বা কালভার্টের প্রস্তাব পাঠিয়ে সরকারি রাজস্বের অপচয় করা হচ্ছে।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে প্রায় দুই কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত রাখায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সামস ইঞ্জিনিয়ারিংকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তাদের দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। একইভাবে বরিশাল ও রংপুরের বিভিন্ন সড়ক সংস্কার প্রকল্পে নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়া সত্ত্বেও কাজ অসম্পূর্ণ রাখা এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নবনির্মিত সড়ক ও সেতুর গাইডওয়াল ধসে পড়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে কাজের তদারকিতে চরম অবহেলা ছিল। এলজিইডির কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম একে নদীর তীব্র স্রোতজনিত কারণ দাবি করে দ্রুততম সময়ে পাইলিং দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল মেরামতের আশ্বাস দিলেও কাজের গুণগত মান নিয়ে স্থানীয় জনগণের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ডিপিপির বরাদ্দ বহির্ভূত অতিরিক্ত অর্থ খরচের বিষয়ে পিরোজপুর ও বরিশাল অঞ্চলে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের তথ্য মিলেছে। পরিকল্পনা কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়াই বিগত অর্থবছরগুলোতে বিধিবহির্ভূতভাবে মোট ১২৪.৩৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ছাড় ও ব্যয় করা হয়েছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসান আম্পান প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে ঢাকার জাপান গার্ডেন সিটিতে ফ্ল্যাট কেনাসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বেশি সম্পদ অর্জনের দায়ে দুদক তাঁর ও তাঁর স্ত্রী মোসাম্মৎ কানিজ ফাতেমার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। অন্যদিকে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক আহসান কবির অডিট আপত্তির কার্যকারিতা ও প্রশাসনিক চাপ এড়াতে অপ্রয়োজনীয় অডিট দেওয়ার অভিযোগ তোলার পাশাপাশি প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি ও বৈষম্যের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের নামে সংঘটিত এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রকল্পে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।