হাজার টাকা চাকুরের শতকোটির সম্পদ, সচিব মহাসিনের হাতে আলাদিনের চেরাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সরকারি খাতায় যার মাসিক বেতন স্কেল মাত্র ৩৭ হাজার টাকা, তার সন্তানের পড়াশোনার পেছনেই প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। আয় ও ব্যয়ের এই আকাশপাতাল ফারাক কেবল কোনো কাল্পনিক গল্পের প্লট নয়, বরং সাভারের ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব মহাসিনের বাস্তব জীবনের চিত্র। মাত্র ১১ বছরের চাকরিজীবনে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি এবং লাগামহীন কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারীর এমন অবিশ্বাস্য আর্থিক উত্থান স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে চরম বিস্ময় ও গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

স্থানীয় ও অনুসন্ধানী সূত্রগুলো প্রকাশ করেছে যে, বিগত সরকারের আমলে সাবেক চেয়ারম্যানের ছত্রচ্ছায়ায় এবং প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরো ইউনিয়ন পরিষদকে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত করেছিলেন মহাসিন। স্থানীয় সরকার আইনের বিধান অনুযায়ী যেকোনো বহুতল বা সাধারণ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবের যৌথ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। আইনের এই অপরিহার্য সুযোগটিকেই নিজের পকেট ভারী করার প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছিলেন তিনি। নকশা অনুমোদনের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি একাই হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ।

তার দুর্নীতির ব্যাপ্তি এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ, অসহায় মানুষের বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করার ফি এবং সাধারণ নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্সের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সরকারি তহবিলের টাকা নয়ছয় করে তিনি প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেছেন নিজের ব্যক্তিগত ভাণ্ডার। উল্লেখ্য, এর আগে সাভারের বীরুলিয়া ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালীনও টেন্ডারবাজি ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে চরম সমালোচিত হয়েছিলেন মহাসিন। সেই সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নে বদলি করা হলেও তার দুর্নীতি ও অবৈধ উপার্জনের চাকা কখনোই থামেনি।

দীর্ঘদিনের এই অবৈধ আয়ের মাধ্যমে মহাসিন নামে-বেনামে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে তার এই বিপুল সম্পদের বেশ কিছু অকাট্য প্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে। জানা গেছে, সাভারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তার রয়েছে একটি বিলাসবহুল ৯ তলা বাড়ি। এছাড়া রাজধানীর উত্তরার উত্তরখান এলাকায় একটি ৩ তলা ভবন, কল্যাণপুরে একাধিক সুরম্য ফ্ল্যাট এবং ধামরাইয়ের মতো বর্ধিষ্ণু এলাকায় ১৩ শতক মূল্যবান জমির সন্ধান পাওয়া গেছে। শুধু স্থাবর সম্পত্তিই নয়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই কালো টাকার বিশাল অংশ তিনি বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে।

সরকারি পদে থেকে এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি। অভিযুক্ত সাবেক ইউপি সচিব মহাসিনের এই পাহাড়সম দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তার অবৈধ আয়ের মূল উৎস খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোর দাবি। এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব ও বেনামি সম্পদের আরও বিস্তারিত তথ্য নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব শিগগিরই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *