ভেজাল পানির অভিযোগে প্রতিবেদন প্রকাশ, দৈনিক জনবাণী’র সাংবাদিক জয়নাল গ্রেপ্তার

 

পটিয়া, (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি,

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দৈনিক জনবাণীর সংবাদকর্মী জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরে সাইবার সুরক্ষা আইনে করা একটি মামলায় তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ, গ্রেপ্তারের আইনি ভিত্তি এবং কারখানার পানির গুণগত মান নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভেজাল ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জয়নাল দৈনিক জনবাণী পত্রিকার সংবাদকর্মী। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক উন্নয়ন সংস্থার চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক।

সীতাকুণ্ড থানা-পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তারের পর সাইবার সুরক্ষা আইনে করা একটি মামলায় চট্টগ্রাম জেলা আদালতে পাঠিয়েছে। মামলাটি সীতাকুণ্ড থানার ৫৬ নম্বর মামলা বলে জানা গেছে।

সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তাঁকে গ্রেপ্তারের আগে কী ধরনের আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল এবং কারখানার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য সংগ্রহে কারখানায় কাজ শুরু

জয়নাল আবেদীনের দাবি অনুযায়ী, গত ২ অক্টোবর তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি ছদ্মবেশে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানায় কাজ শুরু করেন। সেখানে পানির বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভেজাল এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগের বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করেন তিনি। পরে এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

তবে কারখানায় পানির বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা ভেজালের অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিদর্শন, পানির পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন এবং কারখানার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তারের অভিযোগ

প্রতিবেদন প্রকাশের পর মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কর্তৃপক্ষ জয়নাল আবেদীনকে ডেকে নেয় এবং লিখিত অভিযোগ ছাড়াই পুলিশকে খবর দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। জয়নালের পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নুর উল্লাহ কোনো লিখিত অভিযোগ ছাড়াই এবং ঘটনার যথাযথ তদন্ত না করে তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।

অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারের পর তাঁকে থানায় বসিয়ে রাখা হয়। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হলে তাঁকে আদালতে পাঠানো হয়।

তবে গ্রেপ্তারের সময় কী অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছিল, মামলার এজাহারে কী বলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ও আদালতে পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনগত বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও পুলিশের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা জরুরি।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন

জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা কখনো কখনো ছদ্মবেশ বা গোপন অনুসন্ধানের পদ্ধতি ব্যবহার করেন। বিশেষ করে ভোক্তা অধিকার, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতির ব্যবহার নিয়ে পেশাগত ও নৈতিক বিবেচনা রয়েছে।

তবে কোনো সাংবাদিকের অনুসন্ধানী পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে, কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

জয়নাল আবেদীনের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তাই দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বিরুদ্ধে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা যাচাই। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলার আইনগত ভিত্তি এবং গ্রেপ্তারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিশ্চিত করা।

এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতাকে ঘিরে অতীতের অভিযোগ

মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটারকে এর মূল প্রতিষ্ঠান এস এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এস এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শাহাবুদ্দিন আলম অতীতে ঋণসংক্রান্ত অনিয়ম ও ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভিন্ন ব্যাংকের করা শতাধিক মামলা তাঁর বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

২০১৮ সালে ঋণসংক্রান্ত অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ঋণখেলাপির অভিযোগসংক্রান্ত ঘটনায় শাহাবুদ্দিন আলম ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব অভিযোগ ও মামলার বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট নথি এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এস এ গ্রুপের অতীতের ঋণসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে মুসকান ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়া যায় না।

স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার দাবি

সাংবাদিক জয়নাল আবেদীনের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের অধিকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তার তদন্ত ও বিচার হতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

অন্যদিকে, পানির মতো জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত পণ্যের উৎপাদন ও বোতলজাতকরণ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থারও তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারখানার পানির নমুনা পরীক্ষা, উৎপাদনপ্রক্রিয়া পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে করা মামলার এজাহার, গ্রেপ্তারের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ পর্যালোচনার পাশাপাশি কারখানার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে সাংবাদিকের আইনগত অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি থাকলে তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া মানেই তাঁর কণ্ঠরোধের চেষ্টা- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ঘটনার সব তথ্য যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলেই তাঁর প্রকাশিত প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা দরকার।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *