নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার সাভার উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থ আত্মসাৎ, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার এবং বদলি-সংক্রান্ত অনিয়মের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, তিনি ১৫ জুন ২০২৫ তারিখে যোগদান করেন। তাঁর নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং তাঁর দায়িত্ব পালনকালে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মীর আব্দুল বারেক সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফখরুল আলম সমর। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে আর্থিক নথিপত্র, নিরীক্ষা প্রতিবেদন কিংবা তদন্তের ফলাফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই সময়ের পর তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন স্থানে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট, আমিনবাজারে একাধিক প্লট, হেমায়েতপুরে বাড়ি, সিংগাইরে জমি এবং সাভারের অভিজাত এলাকায় একাধিক প্লট রয়েছে। এসব সম্পত্তির মালিকানা, ক্রয়মূল্য, ক্রয়ের সময়কাল এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। তাই সম্পদের প্রকৃত উৎস নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মীর আব্দুল বারেক নিজেকে ফখরুল আলম সমরের ভাই হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব অভিযোগের পরও তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক নথি যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
তাঁর কর্মস্থল পরিবর্তন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের পর তিনি কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ছিলেন। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে বদলি হয়ে আসেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বদলির আদেশ, প্রশাসনিক নথি কিংবা অর্থ লেনদেনের কোনো প্রমাণ এই অভিযোগের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে বদলি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
বর্তমানে মীর আব্দুল বারেক পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ইউপি সদস্যের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। তাঁদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদে তিনি প্রভাব বিস্তার করেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুললে চাপের আশঙ্কা থাকে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে কথা বললে কলকাতা থেকে মুঠোফোনে আওয়ামী লীগের পলাতক কয়েকজন নেতাকর্মী হুমকি দেন। তাঁদের অভিযোগ, এসব নেতাকর্মীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও সখ্য বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কথিত ফোনকল, হুমকির রেকর্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে কর্মস্থল পরিবর্তনের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের দাবি, ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামের নিজ এলাকা ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদে বদলি হওয়ার চেষ্টা করছেন মীর আব্দুল বারেক। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ধামসোনা ইউনিয়নের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি এ উদ্যোগ নিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো বদলির আবেদন, দাপ্তরিক যোগাযোগ কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনিয়মের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তাই অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে প্রশাসনিক নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।
মীর আব্দুল বারেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হলে তাঁর সম্পদের উৎস, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময়কার কর্মকাণ্ড এবং কর্মস্থল পরিবর্তন-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। এ জন্য সম্পত্তির মালিকানা ও ক্রয়সংক্রান্ত নথি, আয়ের বিবরণী, আর্থিক লেনদেন এবং বদলির প্রশাসনিক আদেশ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মীর আব্দুল বারেকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। একই বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্যও এ কারণে পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি পর্যালোচনা ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।