নিজস্ব প্রতিবেদক :
একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ঝাড়ুদার, যাঁর মূল কাজ ভূমি অফিসের আঙিনা ঝাড়ু দেওয়া। অথচ সেই ঝাড়ুদারের টেবিলেই আটকা পড়ে সাধারণ মানুষের শত বছরের স্বত্ব আর কোটি টাকার ভূমির বন্দোবস্ত ফাইল।
তাঁর এক ইশারায় বদলে যায় সরকারি খতিয়ান, আর হাতের মুঠোয় ঘোরে অফিসের অতি গোপনীয় নথি!
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিস যেন অনিয়ম, প্রবঞ্চনা ও জালিয়াতির এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে রয়েছেন শহিদুল আলম ফরহাদ নামীয় এক ‘ঝাড়ুদার’।
যিনি কালক্রমে ভূমি দপ্তরের ‘ছায়া নিয়ন্ত্রক’ বা বেআইনি ‘রেকর্ডকিপার’ হয়ে উঠেছেন। ধলঘাটের নিঃস্ব পরিবারের এই সন্তান সরকারি নথিপত্র পাচার ও দালালি বাণিজ্যের বদৌলতে আজ অঢেল সম্পদের মালিক।
তাঁর এই সিন্ডিকেটের কাছে খোদ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সরেজমিনে দেওয়া আদেশও কার্যত পরাস্ত ও জিম্মি হয়ে পড়েছে।
ঝাড়ুদার থেকে কোটিপতি: অলৌকিক উত্থানের আখ্যান
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়ের করা লিখিত অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০১২ সালে পটিয়ার ধলঘাট ইউনিয়ন তহসিল অফিসে ঝাড়ুদার পদে নিয়োগ পান শহিদুল আলম ফরহাদ (এনআইডি নং: ৩২৭৬৫০৭২৭৯)।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি খ-খাতায় নিয়োগ পাওয়ার পর দীর্ঘ ১৪ বছর তিনি নিজের মূল কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতই ছিলেন না। কিন্তু কোনো অদৃশ্য ক্ষমতার বলে মাসের পর মাস সরকারি কোষাগার থেকে তুলে নিয়েছেন বেতন-ভাতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত ফরহাদের মামা (বর্তমানে শ্বশুর) মো. ইউনুছ ছিলেন পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক। ২০১২ সালে তাঁর মামা-শ্বশুরের প্রভাব খাটিয়ে ধলঘাট ভূমি অফিসে ঝাড়ুদার পদে বেসরকারিভাবে নিয়োগ পান ফরহাদ।
পরবর্তীতে পটিয়া সদর ভূমি অফিসে পদার্পণ ঘটে ফরহাদের। পদ ঝাড়ুদারের হলেও তিনি কাজ শুরু করেন ‘রেকর্ডকিপার’ হিসেবে। সরকারি নথিপত্র সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজের কবজায় নিয়ে গড়ে তোলেন এক গোপন তথ্য বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক।
নামজারি, ভিপি সম্পত্তি ও জমি বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত সংবেদনশীল ফাইল টাকার বিনিময়ে পৌঁছে যেতে থাকে সুবিধাবাদীদের হাতে। এক ব্যক্তির খতিয়ান গায়েব করে অন্য ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়ার মতো ভয়ংকর কারসাজিও হতে থাকে নিয়মিত। এই বেআইনি কারবারের বদৌলতে রাতারাতি বদলে যায় ফরহাদের ভাগ্য।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ভূমি অফিসে ঝাড়ুদার হিসেবে যোগদানের আগে দিনমজুর বাবা নুরুল আলম কর্মহীন হয়ে পড়লে রাজমিস্ত্রির কাজ করে কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চালাতেন।
কিন্তু ভূমি অফিসে যুক্ত হওয়ার পর ধলঘাটের ভাঙাচোরা বসতঘর ছেড়ে শ্রীমাই মৌজায় সীমানাপ্রাচীরঘেরা রাজপ্রাসাদসম বিলাসবহুল বাড়ি হাঁকিয়েছেন তিনি। শ্বশুরকে কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করে দেন। আর নামে-বেনামে কিনেছেন বিঘা বিঘা জমি ও চড়ছেন দামি গাড়িতে।
অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা তথ্য বিবেচনা করে দেখা যায়, একটি দলিলের মাধ্যমেই তিনি ০.৬২২২ একর জমি কিনেছেন প্রায় ৫৪ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। সম্প্রতি সপরিবারে ওমরাহ পালন করে আসা এই ‘ঝাড়ুদার’-এর বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে এখন মাঠে নামছে দুদক।
দলিলের বিষয়ে অভিযুক্ত শহিদুল আলম ফরহাদ বলেন, গ্রহীতাকে আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে সব বেরিয়ে আসবে।
ফাইল আটকে রাখা ও জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অবমাননা
পটিয়ার বাসিন্দা মো. মিন্টু আলম তাঁর একটি জমি বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত ফাইলের (স্মারক নং-৫৪১, ডকেট নং-৩০৬) অগ্রগতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে পটিয়া ভূমি অফিসে ঘুরছিলেন।
কিন্তু ফাইলটি ঝুলিয়ে রেখে মিন্টু আলমকে সরাসরি ফরহাদের কাছে যেতে বলা হয়। মিন্টু আলম ফরহাদের মুখোমুখি হলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়, ফাইল ছাড়তে হলে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা ঘুষ।
ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফরহাদ দম্ভোক্তি করে বলেন, টাকা ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না। উপায়ান্তর না দেখে ভুক্তভোগী বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টিগোচর করার চেষ্টা চালান।
গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক পটিয়া উপজেলা ভূমি অফিস পরিদর্শনে গেলে সেখানে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বিবরণ জেলা প্রশাসককে জানান।
ভুক্তভোগী মিন্টু আলমের অভিযোগ শোনার পর জেলা প্রশাসক দেখতে পান, সরকারি নিয়ম ভঙ্গ করে বন্দোবস্তের মূল ফাইলটি আটকে রেখেছেন ওই বহিরাগত প্রভাব বিস্তারকারী ফরহাদ।
জেলা প্রশাসক তৎক্ষণাৎ ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেন ফরহাদের কাছ থেকে ফাইলটি উদ্ধার করে দ্রুত ‘উপ-নথিভুক্ত’ করার জন্য।
এরপর গত ৩১ আগস্ট তৎকালীন এসিল্যান্ড ফরহাদকে অফিস থেকে বের করে দেন।
অভিযোগের পাহাড় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন জমা পড়ার বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত শহিদুল আলম ফরহাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠালে তিনি কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কাটিং দেন।
সংবাদের শিরোনাম: ‘বসতবাড়ির সামনে সন্দেহজনক ছবি-ভিডিও ধারণ—দুই ব্যক্তি আটক’। তবে মূল অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দিয়ে এড়িয়ে যান ফরহাদ। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য দিলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
এদিকে, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে দুদকে লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী মো. মিন্টু আলম উল্লেখ করেছেন, গত ৩১ আগস্ট ফরহাদকে ভূমি অফিস থেকে বের করে দেওয়ার তথ্য পেয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের উদ্দেশ্যেই তাঁর বাড়িতে যান মিন্টু আলম ও তাঁর এক সঙ্গী।
তাঁদের সঙ্গে ফাইলের বিষয়ে কোনো কথা না বলে নানা টালবাহানা শুরু করেন বাঁশখালী ভূমি অফিসের নাজির ওয়াহিদুল্লাহ সিকদার ও শহিদুল আলম ফরহাদ।
একপর্যায়ে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে মিথ্যা তথ্য জুড়ে দিয়ে ওসি ও এসআই সমীর ভট্টাচার্যকে দিয়ে আটকে রেখে বেআইনিভাবে থানা হাজতে ২৬ ঘণ্টা আটকে রেখে নানাভাবে হয়রানি করেন এবং মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে সম্মানহানি করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপথ্যে ‘নাটের গুরু’ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
একজন সাধারণ ঝাড়ুদার কীভাবে বছরের পর বছর পুরো অফিসের রেকর্ডরুম কবজা করে রাখলেন এবং কীভাবে অফিসের কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসকের আদেশ অমান্য করার দুঃসাহস দেখালেন—তার সন্ধান করতে গিয়ে উঠে এসেছে বাঁশখালী ভূমি অফিসের নাজির ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারের নাম।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারকে (এনআইডি নং: ৬৪৩৭৬৮৩৩৮৯) এই সিন্ডিকেটের ‘নাটের গুরু’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পটিয়া ও বাঁশখালীতে দায়িত্ব পালনকালে ওয়াহিদুল্লাহ সিকদার প্রশাসনিক সুরক্ষার ছাতা মেলে ধরেছিলেন এই ঝাড়ুদার ফরহাদের ওপর। সরকারি জমি গায়েব করা থেকে শুরু করে খতিয়ান জালিয়াতি—সব ক্ষেত্রেই এই প্রভাবশালী চক্রটি কলকাঠি নাড়ে।
এ বিষয়ে বাঁশখালী ভূমি অফিসের নাজির ওয়াহিদুল্লাহ সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের কাছে সব অভিযোগ একবাক্যে অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগকারী মিন্টু আলমকে আমি চিনি না। এসব অভিযোগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। মিন্টু আলম একজন মামলাবাজ।
তবে ঝাড়ুদার ফরহাদের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্বীকার করেন, ফরহাদ পটিয়া ভূমি অফিসেই কর্মরত আছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আরও স্পষ্ট হতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠালে তিনিও ফরহাদের মতোই কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কাটিং দেন এবং দালাল আটকের সংবাদের একটি ভিডিও পাঠিয়ে অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। পরবর্তীতে তিনি বক্তব্য দিলে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
পটিয়াজুড়ে তোলপাড়, কড়া নজরদারিতে প্রশাসন
এদিকে, এক সাধারণ ঝাড়ুদারের কোটিপতি হওয়ার গল্প এবং জেলা প্রশাসকের নির্দেশ অমান্য করে সাধারণ সেবাগ্রহীতাকে পিটিয়ে মুখ বদলে দেওয়ার হুমকির খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো পটিয়া উপজেলা জুড়ে চরম অসন্তোষ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ভূমি অফিসের মতো স্পর্শকাতর স্থানে নাগরিকদের মালিকানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ঘুষ ও জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষায় পটিয়ার সাধারণ মানুষ।