নিজস্ব সংবাদদাতা :
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে শিক্ষকদের বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তিতে ঘুষ দাবি এবং প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক শিক্ষিকার মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য ৩০ হাজার টাকা দাবি, পছন্দের বিদ্যালয়ে সংযুক্তির ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন এবং বিদ্যালয়ের স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, আর্থিক লেনদেন ছাড়া কোনো কোনো ফাইল আটকে রাখা হয়। প্রতিবাদ করলে চাকরিসংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে দৈনিক নিরপেক্ষ বার্তার অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কথিত বিপুল সম্পদ ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আনা হয়। এবার তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক হয়রানি, বদলি-ডেপুটেশন বাণিজ্য এবং বিদ্যালয়ের সরকারি বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটিতেও ৩০ হাজার টাকা!
ভুক্তভোগী এক শিক্ষিকার অভিযোগ, ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করলে তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে কারণ দর্শানোর নোটিশের মুখে পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে চড়া সুদে ঋণ নেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অর্থ দিয়েই তাঁকে ছুটির ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
একজন নারী শিক্ষকের মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো প্রাপ্য সুবিধা পেতেও যদি অর্থের চাপ মোকাবিলা করতে হয়, তবে তা সরকারি সেবা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
বদলি-ডেপুটেশন ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
শিক্ষকদের অভিযোগ, পছন্দের বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন বা সাময়িক সংযুক্তি পেতে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তাঁদের দাবি, একাধিক শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় সাতানিয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলীম ইবনাতকে পৌরসভা বিদ্যালয়ে, শাকবুনিয়ার জাকারিয়াকে লক্ষ্মীপাশা আমিনিয়া বিদ্যালয়ে, গারুড়িয়ার শারমিন আক্তারকে দেউলি বিদ্যালয়ে, মতিউর রহমান বিদ্যালয়ের শিবশংকর দাসকে খেজুরা ভরপাশা বিদ্যালয়ে এবং পোড়াচিপার আমিনুল ইসলামকে দক্ষিণ দাওকাঠি বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জান্নাতুন ফেরদৌসি, লাইজু আক্তার, ইতি আক্তার, সাথী আক্তার, সোনিয়া আক্তার, জামিল আক্তার, আনিকা ইবনাত, কাকলী দে ও নাসরিন সুলতানাসহ আরও কয়েকজন শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও ব্যাংকঋণের কাগজেও হয়রানি?
শিক্ষকদের ভাষ্য, বদলি ও ডেপুটেশনের বাইরেও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা উত্তোলন, পেনশন-সংক্রান্ত কাজ, ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে স্বাক্ষর এবং অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা পেতে তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল এগিয়ে নিতে আর্থিক লেনদেনের চাপ দেওয়া হয়। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা কিংবা চাকরিসংক্রান্ত জটিলতায় ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০–৪০ শতাংশ কেটে রাখার অভিযোগ
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রমের অর্থ বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয় পর্যায়ের স্লিপ প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা কেটে রাখার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে তিন-চার বছর আগের ফাইল পুনরায় সামনে এনে বিভিন্ন ভুলত্রুটি দেখিয়ে প্রধান শিক্ষকদের চাপে রাখার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে কেটে রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা কেবল প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয় থাকবে না; সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে আসবে।
ঘুষ লেনদেনে মধ্যস্থতাকারী ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কথিত অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে কয়েকজনকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ প্রসঙ্গে তাঁদের অভিযোগে সাবেক শিক্ষক সেলিম, সহকারী শিক্ষক সালেহীন শিকদার এবং প্রধান শিক্ষক পরশের নাম এসেছে।
এ ছাড়া শিক্ষা কর্মকর্তার অবসরপ্রাপ্ত স্ত্রী ও ছোট ভাই নুরুলকে ব্যবহার করে শিক্ষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং ঘুষ লেনদেন পরিচালনার অভিযোগও উত্থাপন করেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগগুলো যাচাই করতে কথিত
কুয়াকাটার হোটেল জননীসহ সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন
শিক্ষকদের অভিযোগের পাশাপাশি শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আমিনের কথিত সম্পদ ও আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। অভিযোগকারীরা কুয়াকাটার হোটেল জননীসহ বরিশালের বিভিন্ন সম্পদের কথা উল্লেখ করেছেন।
তদন্তের দাবি, প্রতিশোধমূলক হয়রানি বন্ধের আহ্বান
বাকেরগঞ্জের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো নিয়ে তাঁরা দুদক, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করা হোক এবং কেউ দোষী প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর কারণে কোনো শিক্ষক যেন প্রশাসনিক হয়রানি, বদলি-সংক্রান্ত চাপ কিংবা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সবকিছু অস্বীকার করেন। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য এ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে?
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ের কার্যক্রম তদারক করা এবং সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা। ফলে বদলি, ডেপুটেশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি, পেনশন ও আর্থিক সুবিধা নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো সেগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা।
বাকেরগঞ্জের শিক্ষকরা চান, অভিযোগগুলো যেন কেবল লিখিত অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় আর্থিক নিরীক্ষা, প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা হোক। এতে অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে; আর অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও স্পষ্ট হবে।
শিক্ষকদের প্রাপ্য সেবা পেতে অর্থ দিতে হবে—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কত দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করে।