জাতীয় গৃহায়ণে অনিয়মের অভিযোগ, মামলা সত্ত্বেও ১৯ বছর ধরে ঢাকায় বহাল দুই প্রকৌশলী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা, অর্থায়ন, সরকারি জমি দখল এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও স্বপদে বহাল রয়েছেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (এনএইচএ) ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে টানা ১৯ বছর ঢাকায় অবস্থান করে তিনি একটি বলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মিরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদ।

গণঅভ্যুত্থান দমনে অর্থায়ন ও হত্যা মামলা: অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় মো. হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১২ মে রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে করা ওই মামলায় হারিজুর রহমানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় সন্ত্রাসী হামলা ও সহিংসতায় অন্যতম প্রধান অর্থদাতা হিসেবে অভিযোগ আনা হয়েছে।

৭ একর জমি দখল ও ৩৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ: সংস্থাটির সাবেক ও বর্তমান একাধিক সূত্রে জানা যায়, পল্লবীর ঝিলপাড় এলাকায় প্রায় ৭ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রেখে টিনের ঘর নির্মাণের মাধ্যমে ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর যোগসাজশে তৎকালীন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমান এই দখলের নেপথ্যে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১-এ দণ্ডবিধির ৪০৯, ২১৭ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা (মামলা নম্বর ২৯) বিচারাধীন রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে জমিটি পুনরুদ্ধার করে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ঢাকায় ১৯ বছরের অবস্থান: ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিচয় থাকলেও হারিজুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টানা ১৯ বছর ঢাকায় বিভিন্ন প্রভাবশালী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও পুরোনো সহযোগীদের নিয়ে তিনি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং অন্যান্য কর্মকর্তার ঢাকায় বদলিতে বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তাঁর অন্যতম সহযোগী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার মোর্শেদ (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) টানা ১৯ বছর ধরে ঢাকায় কর্মরত রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ সংগ্রহের একাধিক অভিযোগ দুদকে তদন্তাধীন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বপ্ননগর ও দোলনচাঁপা-কনকচাঁপা প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: মিরপুরের ৯ নম্বর সেকশনের ‘স্বপ্ননগর-দ্বিতীয় পর্ব’ প্রকল্পে প্রায় ৭৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার অকেজো মালামাল গোপনে বিক্রি করে নথিপত্রে মাত্র ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা দেখানোর মাধ্যমে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের অর্জিত অবৈধ অর্থে বসিলা, ধানমন্ডি, উত্তরা, পাবনা ও গাজীপুরে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের ‘দোলনচাঁপা’ ও ‘কনকচাঁপা’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকাকালে হারিজুর রহমান প্রকল্পের মূল ব্যয় ৪৬৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৪১ কোটি ১১ লাখ টাকা করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কলোনির মূল ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য বরাদ্দ করা ২৫৩টি ফ্ল্যাট কমিয়ে ১১৮টি করা হয় এবং বাকি ১৬৬টি ফ্ল্যাট তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করার অভিযোগ রয়েছে।

গ্রাহক ভোগান্তি ও তদন্তের অগ্রগতি: ঢাকা সার্কেলের সাধারণ সেবাগ্রহীতারা দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ ও দালালচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বর্তমানে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক, থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকায় সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হারিজুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *