অনিয়ম-দুর্নীতি-করদাতাদের সাথে আঁতাত, সবকিছুতেই সর্বেসর্বা কর কমিশনার মুরাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি ও করদাতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের কারণে প্রতি বছর রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব হারাতে হচ্ছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও কর ফাঁকির পথ উন্মুক্ত রাখার ফলে সরকারের বছরে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ করপোরেট ও আয়কর খাতে অনিয়মের মাধ্যমে সাধিত হয়। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের এই আর্থিক ক্ষতি রোধ করতে হলে অবিলম্বে দুর্নীতিতে জড়িত রাজস্ব কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা জরুরি, যা বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রচেষ্টাকে বেগবান করতে সহায়তা করবে।

বিগত সরকারের আমলে প্রভাবশালী ও সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা ভোগকারী অনেক কর্মকর্তা এখনো এনবিআরে বহাল তবিয়তে থেকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা কর অঞ্চল-৩ এর অতিরিক্ত কমিশনার মো. মুরাদ আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক তদবির এবং করদাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্য গড়ে তুলে অবৈধ সম্পদ অর্জনের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম পাহাড়তলীর মরহুম মমতাজ উদ্দিনের ছেলে মুরাদ আহমেদ ২০০৫ সালে ২৪তম বিসিএস (কর) ক্যাডার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে যে, বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় কর্মস্থলে পোস্টিং বাগিয়ে নেন এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত নানা দুর্নীতির অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেন।

তার কর্মজীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করলে নজিরবিহীন অনিয়মের চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে পরিদর্শী রেঞ্জ-৪, কর অঞ্চল-১৪ এবং পরবর্তীতে কর অঞ্চল-১৫ এ কর্মরত থাকাকালে করদাতাদের নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল ও হয়রানি করে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালে তাকে পরিদর্শী রেঞ্জ-৩, কর অঞ্চল-৪ এ বদলি করা হলেও সেটি ছিল মূলত একটি লোক দেখানো বদলি, কারণ তাকে সেবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকেই আরেকটি সমমানের গুরুত্বপূর্ণ পদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ভিন্ন মতাদর্শের অনেক কর্মকর্তাকে বিগত আমলে ঢাকার বাইরে শাস্তিমূলক বদলি করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে মুরাদ আহমেদ তার প্রায় পুরো কর্মজীবনই রাজধানী ঢাকায় কাটিয়েছেন।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ একটি আন্দোলনের সময় বদলি আদেশ ছিঁড়ে ফেলা এবং অসদাচরণের অভিযোগে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার বেতন গ্রেড তিন ধাপ অবনমিত করা হয়। তবে বর্তমান সরকার পরিবর্তনের পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশনায় সাবেক রাষ্ট্রপতির আদেশে অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাসহ এনবিআরের মোট ২০ জন কর্মকর্তার পূর্বের দণ্ড ও শাস্তি মওকুফ করা হয়। এর মাত্র কিছুদিন পর, চলতি বছরের আগস্ট মাসে কর অঞ্চল যশোরে কর্মরত থাকা অবস্থায় তদবির ও অবৈধ অর্থের জোরে তিনি পুনরায় ঢাকা কর অঞ্চল-৩ এ বদলি হয়ে আসেন।

চাকরিজীবনের এই সুদীর্ঘ সময়ে নানামুখী দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তার একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট ও বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ৩/২১ নম্বর ভবনের সপ্তম তলার ‘এ’ ব্লকের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিক তিনি নিজেই, যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা এবং ওই ভবনের ফ্ল্যাট মালিকের তালিকার কাগজপত্রেও তার নাম পাওয়া গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিতে তিনি প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৪০১১) নিজের নামে না রেখে তার ছোট ভাই মুনতাসির আহমেদের নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ব্যবহার করছেন। এই বিষয়ে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সাংবাদিকের পরিচয় শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

চতুর্থ গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে এই ধরনের বিলাসিতা ও বিপুল সম্পদের বিস্তর ফারাক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তার বেতনের অর্ধেকের সমপরিমাণ অর্থ খরচ করে কেবল একজন ব্যক্তিগত ড্রাইভার রেখেছেন এবং ছুটির দিনে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে নিয়মিত ব্যয়বহুল ভ্রমণে যান। রাষ্ট্রের নজর এড়াতে তার বেশিরভাগ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি স্ত্রী মাহমুদা রশীদ, দুই ছেলে মাশরুর আহমেদ ও মাহফুজ আহমেদসহ বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামে ক্রয় করা হয়েছে। এসব গুরুতর দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বর্তমানে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজস্ব প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা দেশের সামগ্রিক কর আদায় ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিতর্কিত ও দুর্নীতিপরায়ণ কোনো কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকলে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তেমনি সাধারণ করদাতাদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, মুরাদ আহমেদের অতীত কর্মকাউন্সিল বা পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করলেই তার দুর্নীতির আরও অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হবে। অথচ দীর্ঘ ১৫ দিন ধরে এই প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই ও বক্তব্যের জন্য তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং সরাসরি সাক্ষাতের অনুরোধেও সাড়া দেননি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *