লাকসাম রেলওয়েতে কিশোর চন্দ্র ও সুফিয়ান সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন নৈরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:

লাকসাম রেলওয়ে বিদ্যুৎ বিভাগে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলছে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির রাজত্ব। দাপ্তরিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যুৎ বিভাগে কর্মরত লাইনম্যান গ্রেড-২ সুফিয়ানুর রহমান। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) কিশোর চন্দ্র দেব বর্মার ছত্রছায়ায় ও প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে তিনি লাকসাম রেলওয়ে এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, লাকসাম রেলওয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের আওতাধীন রয়েছে লাকসাম থেকে আখাউড়ার গঙ্গাসাগর, লাকসাম থেকে ফেনীর মুহুরীগঞ্জ এবং লাকসাম থেকে নোয়াখালী স্টেশন পর্যন্ত বিস্তৃত রেলওয়ের বাসাবাড়ি ও স্টেশনের বৈদ্যুতিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব। এসকল এলাকায় নানা অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া, মিটার বাইপাস করা, কোয়ার্টার দখল এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে লাইনম্যান সুফিয়ানের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লাকসাম রেলওয়ে কলোনিতে বর্তমানে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫টি পরিত্যক্ত খালি বাসা রয়েছে। এসকল বাসাবাড়ির সিলগালা ও তালা ভেঙে বহিরাগতদের অবৈধভাবে দখল করে বসবাস করার সুযোগ করে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। অথচ রেলওয়ের পক্ষ থেকে “দিনে উচ্ছেদ, রাতে বসবাস” শ্লোগানে উচ্ছেদের নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা লোপাট এবং ব্যক্তিগত পকেট ভারী করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত অসাধু কর্মকর্তারা। খালি এসব বাসায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে লাইনম্যান সুফিয়ান ও প্রকৌশলী কিশোর চন্দ্র দেব বর্মা প্রতিমাসে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। এছাড়া লাকসাম রেলওয়ে জিআরপি পুলিশ ব্যারাকেও মিটারবিহীন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কাগজে-কলমে লাইনম্যান সুফিয়ানকে কুমিল্লা স্টেশনে পদায়ন দেখানো হলেও তিনি সেখানে না থেকে কুমিল্লা স্টেশনসংলগ্ন মালী কলোনি ও রেলওয়ে কলোনির আনুমানিক ১০ থেকে ১৫টি পরিত্যক্ত খালি বাসায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং স্টেশনসংলগ্ন বিভিন্ন দোকানে মিটার বাইপাস করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছেন। এসকল অবৈধ কর্মকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে প্রকৌশলী কিশোর চন্দ্র দেব বর্মার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সুফিয়ান নিজের নামে বরাদ্দকৃত কোয়ার্টারে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নিয়ে টানা ১০ বছর ধরে তা ব্যবহার করে আসছিলেন। নিজের নামে বরাদ্দকৃত সেই কোয়ার্টার অন্যর কাছে ভাড়া দিয়ে তিনি লাকসাম রেলওয়ে সরকারি রেষ্ট হাউজের পাশের (টি/৭-সি) বাসার সিলগালা ভেঙে সপরিবার বসবাস শুরু করেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রকাশের পরপরই রাতের আঁধারে তার নামে বরাদ্দকৃত বাসা থেকে অবৈধ গ্যাস সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং আবুল কালামের ছেলে কামালের নামে তা চালিয়ে দেওয়া হয়। ক্ষমতার দাপটে টানা ১০ বছর গ্যাস ব্যবহার করে তিনি প্রায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন।
শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আনুমানিক এক সপ্তাহ পর লাকসাম বিদ্যুৎ বিভাগের স্টোরে রক্ষিত বিভিন্ন স্টেশনের প্রায় ২০০ কেজি পুরোনো বৈদ্যুতিক তার (ইলেকট্রিক ওয়্যার) দুই বস্তা লুট করে রাতের অন্ধকারে বিক্রি করে দেয় সুফিয়ান বাহিনী। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১ লাখ টাকা। পরবর্তীতে এই চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে চোরের তালা ভেঙে চুরির ঘটনা সাজানো হয়।
অনুসন্ধানে আরও প্রকাশ পায়, লাকসাম বিদ্যুৎ অফিসে কোনো নতুন বা পুরোনো কর্মচারী পোস্টিং নিয়ে যোগাদন করলেই তার গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই সুফিয়ান সিন্ডিকেট। দপ্তরের কোনো কর্মচারী ছুটি বা বিশ্রামে যেতে চাইলে সুফিয়ান সিন্ডিকেটের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাকে কখন কোথায় ডিউটি দেওয়া হবে, সেই একক সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকেন সুফিয়ান। এমনকি সুফিয়ানের ওপর কোনো সিনিয়র কারিগর বা মিস্ত্রি পদায়ন থাকলেও কিশোর চন্দ্র দেব বর্মা সিন্ডিকেটের বাইরে তাদের কোনো মূল্যায়ন করেন না; বরং তাদের ওপর পেশিশক্তি ও আধিপত্য খাটানো হয়। লাকসাম রেলওয়েতে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শনে এলে সেখানেও সুফিয়ানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
এ সকল বিষয়ে অভিযুক্ত লাইনম্যান সুফিয়ানুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে, প্রমাণ থাকা স্বত্বেও অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) কিশোর চন্দ্র দেব বর্মার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *