নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামে এক সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও ইগোর জেরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিরুদ্ধে। এর ফলে দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অচল ছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নতুনবাজার কার্যালয়ের যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম। বিশেষ করে জরিমানা ছাড়াই মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদের শেষ দিনে হুট করে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় কার্যালয়ের ব্যাংক বুথও। এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত সেবাগ্রহীতা চরম দুর্ভোগে পড়েন এবং কার্যালয়ের সামনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পিডিবির ষোলশহর সাবস্টেশন থেকে বিআরটিএ নতুনবাজার কার্যালয়ের মূল বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। দীর্ঘ ভোগান্তির পর দুপুর ২টার দিকে পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করা হয়। তবে এই সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ চরম হেনস্তার শিকার হন।
বিআরটিএর উপপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল হক সরাসরি অভিযোগ করে জানান, পিডিবির ষোলশহরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহর ব্যক্তিগত ক্ষোভের জের ধরেই এই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। কিছুদিন আগে পিডিবি কর্মকর্তা সানাউল্লাহ একটি গাড়ির কাগজপত্র হালনাগাদ করার জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু গাড়িটির আইবাস (iBAS) কোডসংক্রান্ত অসঙ্গতি এবং প্রকল্পের গাড়ি কেন্দ্রীয় পরিবহন পুলে জমা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট সরকারি বিধান থাকায় বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ নিয়মানুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে সেই সেবা দিতে পারেনি। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা ছিল, যেখানে কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনিচ্ছা বা অসহযোগিতা ছিল না।
উপপরিচালক আরও দাবি করেন, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে পিডিবি প্রকৌশলী তাঁর ব্যক্তিগত ইগো বা জিদ চরিতার্থ করতেই কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করান। অথচ বিআরটিএর মাসিক বিদ্যুৎ বিল নিয়মিত এক লাখ টাকার বেশি হলেও সে সময় সামান্য কিছু বকেয়া ছিল, যার জন্য কোনো নোটিশ ছাড়াই এভাবে বিদ্যুৎ কেটে দেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এদিকে বিআরটিএর পক্ষ থেকে ওঠা এই ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন পিডিবি কর্মকর্তারা। পিডিবির প্রধান প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় প্রটোকল মেনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। এর পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। পরবর্তীতে দ্রুত বিল পরিশোধের বিষয়টি অবহিত করা হলে জনস্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করা হয়। অন্যদিকে অভিযুক্ত পিডিবি কর্মকর্তা ও ষোলশহরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেন, “পুরোনো বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সময়মতো বিল পরিশোধ করা হয়নি। যে কারণে নিয়মানুযায়ী সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল করা হয়।”
বিআরটিএ সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবারটি ছিল জরিমানা ছাড়াই মোটরযানের কাগজপত্র হালনাগাদ করার শেষ দিন। ফলে সকাল থেকেই বাস, ট্রাক ও প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত যানবাহন নিয়ে শত শত মানুষ কার্যালয়ে ভিড় জমিয়েছিলেন। সকাল ৯টায় কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রথম দেড় ঘণ্টা স্বাভাবিকভাবে কাজ চললেও হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পুরো দাপ্তরিক পরিবেশ থমকে যায়। একই সঙ্গে কার্যালয়ের ভেতরে থাকা ব্যাংক বুথের অনলাইন লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু গ্রাহক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফি বা টাকা জমা দিতে পারেননি। এমনকি অনেকে জরিমানা ছাড়া কাগজপত্র হালনাগাদ করার সোনালী সুযোগ হারিয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় বহু সেবাগ্রহীতা গাড়ি ও কাগজপত্রসহ কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়কের নতুনবাজার এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে বিদ্যুৎ আসার পর ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া গ্রাহকদের কাজ সম্পন্ন করতে ওইদিন রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
সরকারি দুটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার প্রশাসনিক জটিলতা, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সামান্য মতপার্থক্য থাকতেই পারে; কিন্তু সেই দাপ্তরিক বিরোধের খেসারত কেন সাধারণ নাগরিক ও সেবাগ্রহীতাদের দিতে হবে—সেই প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে তুলেছেন সচেতন মহল ও বিআরটিএর কর্মকর্তারা।