আমতলীর গাজীপুরে প্রধান শিক্ষক শাহীন মাহমুদের বিরুদ্ধে ২৬ দফা দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বরগুনার আমতলীর গাজীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। পটুয়াখালী দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যালয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীদের পক্ষে গত ১৮ অক্টোবর মো. নাসির উদ্দীন এবং অভিভাবক ও স্থানীয়দের পক্ষে আ. বাতেন দেওয়ান, মো. নুরুজ্জামান শিকদার, মো. নজরুল ইসলাম এ অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষকদের কাছ থেকে জোর করে রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর নেওয়া, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি নেওয়া, বিদ্যালয় চলাকালীন কোচিং করানো, সরকারি অনুদানের পাঁচ লক্ষ টাকার মধ্যে অর্ধেক টাকা স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকদের না জানিয়ে ব্যয় করার মৌখিক কথা জানালেও বাকি টাকার কোনো হদিস নেই।

এছাড়াও বিদ্যালয়ে সব ধরনের রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণে বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা না দেওয়া।

সরকারি নিয়মানুযায়ী বিদ্যালয়ের সব ব্যাংক হিসাব প্রধান শিক্ষক ও সভাপতি অথবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)-এর যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি তা না করে তাঁর পছন্দসই একজন শিক্ষককে নিয়ে হিসাব পরিচালনা করছেন এবং ইচ্ছামতো টাকা তুলে ব্যয় করছেন।

টিউশনের ফির টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সঠিকভাবে বণ্টন না করে বিগত ২ বছর ধরে তিনি তালবাহানা করছেন। এছাড়া বিগত বছরে সাবেক সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে ৯০,০০০/- টাকা উত্তোলন করেছেন। সম্প্রতি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা উত্তোলন করে বিদ্যালয় তহবিলে ৯০,০০০/- টাকা জমা দিয়ে ৩০ হাজার টাকা নিজে রেখে দেন। বর্তমানে গচ্ছিত ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন বলে জানা যায়।

সাবেক সভাপতি আব্দুর রব মিয়া ২ লাখ টাকা প্রদান করে দাতা সদস্য হয়েছিলেন, সেই টাকার কোনো হদিস নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে ফরম পূরণের সময় প্রবেশপত্র, মার্কশিট, সনদপত্রের ফি নেওয়া হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ছুটির আগে বা পরে পড়ানোর নিয়ম থাকলেও ভালো শিক্ষার্থীদেরও বাধ্য করে প্রতি বিষয়ে ১ হাজার করে টাকায় কোচিং করানো হচ্ছে।

কোচিংয়ের আয়ের ১০ শতাংশ বিদ্যালয় ফান্ডে জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি তা জমা দেননি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজে কোচিংয়ে না পড়িয়েও মাসিক ৫ হাজার টাকা করে নেন। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আসবাবপত্র, যেমন: বেঞ্চ, প্রিন্টার ইত্যাদি সরঞ্জাম তিনি নিজের বাসায় নিয়ে ব্যবহার করেন।

২০২৫ সালে দুদক পটুয়াখালী কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়ের ‘সততা স্টোর’-এর জন্য প্রদত্ত ২৫,০০০/- টাকা শিক্ষক-কর্মচারীদের না জানিয়ে তিনি নিজের কাছে রেখে দেন।

শিক্ষকদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ফাঁকা রেজুলেশন বইয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং ৮ থেকে ১০টি রেজুলেশন বই বেআইনিভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারি নিয়মে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা হাতে রাখার বিধান থাকলেও তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতে রেখে দিচ্ছেন। ভর্তি নীতিমালায় ৫০০/- টাকা নির্ধারিত থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে এবং মোট কত টাকা আদায় হয়েছে, তার কোনো হিসাব দেননি।

একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২,০০০/- থেকে ৩,০০০/- টাকা নিয়ে বাসায় বসে ভর্তি করানো হয়। এছাড়া বাছাই পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ৫,০০০/- থেকে ২০,০০০/- টাকার বিনিময়ে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়, যা বিদ্যালয় তহবিলে জমা হয় না বলে অভিযোগ।

নিজের দুর্নীতি ঢাকতে তিনি সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করে একাধিক রেজুলেশন ও ভাউচার তৈরি করারও অভিযোগ রয়েছে।

২০২১ সালের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে নিজের আপন ভাইকে দিয়ে হাইকোর্টে মামলা করিয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কমিটি বহাল রাখেন। এছাড়া এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রধান শিক্ষক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েও হাইকোর্টে মামলা করে প্রধান শিক্ষকের পদটি স্থগিত করে রেখেছেন।

প্রতি বছর সরকার কর্তৃক ৫০০০/- টাকা দেওয়া হয় গাছ লাগানোর জন্য। গাছ না লাগিয়ে উক্ত টাকা কী করছেন, তা কেউ জানেন না। প্রতি বছর ২০-৩০ জন ছাত্রছাত্রীর নিজ নাম/পিতার নাম/মাতার নামে ইচ্ছাকৃত ভুল করে তারপর ভুল সংশোধনের জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে নেন।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শাহীন মাহমুদ তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন।

আমতলী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতি.) মো. টিপু সুলতান জানান, অভিযোগের কপি পেয়েছি, তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “দুদকে অভিযোগ করেছে, তার একটি অভিযোগপত্র পেয়েছি। অভিযোগ অনুযায়ী সত্যতা পেলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *