পবিপ্রবিতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও সরকারের ৮০ লাখ টাকার ক্ষতি: দুদকের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে অবৈধ নিয়োগ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা এই মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) অনুমোদন ব্যতিরেকে এবং নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত পদের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দিয়ে সরকারের ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় দায়ের করা এ মামলায় তৎকালীন রিজেন্ট বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বাছাই বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত মিলেছে।

প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক জটপাকানো স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন পরিণত হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট পারিবারিক বলয়ে, যেখানে ২৫টিরও বেশি দম্পতি সহ আত্মীয়স্বজনদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তৎকালীন উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের মেয়াদে রিজেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে ৫৮ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হলেও পূর্ববর্তী নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোতে পদ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৯টি। সেকশন অফিসার পদে মাত্র তিনটি শূন্য পদের বিপরীতে ছয়জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন উপাচার্যের নিজের ছেলে শাওন চন্দ্র সামন্ত তনু। এছাড়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পবিপ্রবি কর্মকর্তা সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের নিকটাত্মীয়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার সন্তান এবং ছাত্রলীগ নেতাদের স্বজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৮ সালের ইউজিসির অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে সেকশন অফিসারের মোট ৩০টি পদের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে সেখানে ৪৮ জনকে পদায়ন করা হয়।

প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলা কেবল কর্মকর্তা পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা প্রসারিত হয়েছিল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও। ২০২২ সালের মে মাসে পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগে ইউজিসির কোনো পূর্বানুমোদন ছাড়াই প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। তীব্র সমালোচনার মুখে তৎকালীন সময়ে প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হলেও পরবর্তী সময়ে কোনো নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁদের একজন ছিলেন ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রী। একইভাবে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং এবং ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগে ব্যাপক ছাত্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে তৎকালীন এক সহকারী অধ্যাপকের স্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই যৌথ অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসু কেবল আর্থিক অনিয়মেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগেও অভিযুক্ত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হল থেকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া এবং সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিতর্কিত বক্তব্যের অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র তোপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী বরখাস্তের সিদ্ধান্ত না আসায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সমন্বিত এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া এখন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক জবাবদিহির মুখোমুখি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *