বিএডিসিতে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পিডি নিয়োগ, টেন্ডার কারসাজির অভিযোগের পরও বহাল ইব্রাহিম খলিল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএডিসির দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড, মাফিয়া খ্যাত প্রকল্প পরিচালক ইব্রাহিম খলিল বেসামাল হয়ে টেন্ডার কারসাজি করে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিগত স্বৈরাচারী পতিত লীগ সরকারের আমলে কৃষিবিদ বাহার উদ্দিন নাসিমের আস্থাভাজন হওয়ার কারণে বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্য ও অবৈধ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাকরির সিংহভাগ সময় বিএডিসির প্রধান কার্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ আগলে রেখে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মহা ধুমধামে দুর্নীতিপরায়ণ লীগের দোসর পিডি ইব্রাহিম খলিল। এখন আবার বনে গেছেন রাতারাতি ভোল পাল্টে বিএনপিপন্থী তিনি। দুর্নীতির দৌরাত্ম্য চরমভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন কোন ক্ষমতাবলে পিডি ইব্রাহিম খলিল। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে তুলেছেন সুবিশাল সিন্ডিকেট বাহিনী, সেই বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে হাতিয়ে নিচ্ছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ বলে একাধিক সূত্রে আরও জানা গেছে।

সূত্রে আরও জানা গেছে, প্রকল্পের সুফল না হলেও পিডি ইব্রাহিম খলিলের আর্থিক সুফল মিলেছে হরহামেশাই বলে একাধিক কর্মকর্তা জানান। একাধিক ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদার কর্তৃক সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পিডি ইব্রাহিম খলিলের বিরুদ্ধে দরপত্রের বিপরীতে তাঁর মনোনীত ঠিকাদারদের কার্যাদেশ প্রদান করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা বলে অভিযোগ করেও এখনো তাঁরা কোনো প্রতিকার পাননি বলে একাধিক ঠিকাদার সূত্রে জানা গেছে। তাঁর অবৈধ টাকার প্রভাবে সেই সব অভিযোগ ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে, কোন অদৃশ্য শক্তির বলে।

সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর বিদ্যমান “বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থাদির আধুনিকীকরণ এবং উন্নয়ন (২য় পর্যায়)” শীর্ষক প্রকল্পে নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের অভিযোগে সংস্থার সাধারণ কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপান-উতোর বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, কেবল ঊর্ধ্বতন এক কর্তার আশীর্বাদে নিয়মনীতি শিথিল করে অনেক যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে বিশেষ বিবেচনায় প্রকল্প পরিচালক হিসেবে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে বিষয়টি নিয়ে কানাঘুষা শোনা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উক্ত প্রকল্পের মেয়াদ মার্চ, ২০২৫ হতে ফেব্রুয়ারি ২০২৮ ইং পর্যন্ত। পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ০৯/০২/২০১৬ তারিখে, ২০.৮০৪.০২২.০০.০০.০০৬.২০১০/৪ স্মারকে জারিকৃত অবশ্য পালনীয় নির্দেশাবলির ৩.২ (ঙ) অনুযায়ী, “প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস চাকরির মেয়াদ থাকতে হবে” মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু ইব্রাহিম খলিলের চাকরির মেয়াদ প্রকল্প শেষ হওয়ার ছয় মাসের আগেই শেষ হয়ে যাবে। তাছাড়া ৩.২(খ) অনুযায়ী যে প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা এবং প্রকিউরমেন্ট-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের আবশ্যকতা রয়েছে, তাতেও তাঁর ঘাটতি রয়েছে। মহা ঘুষখোর, দুর্নীতির বরপুত্র, তদবিরবাজ এই কর্মকর্তা আওয়ামী সরকারের পুরোটা সময় ঢাকায় পোস্টিং নিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন।

“মুজিব বর্ষে বিএডিসি, কৃষি সেবায় দিবানিশি” স্লোগান খুব গর্বভরে প্রচার করতেন তৎকালীন এই পরিচালক। বাহাউদ্দিন নাসিমের সঙ্গে সখ্যের কারণে একাধিক কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন সুচতুর ইব্রাহিম খলিল। এখন আবার ভোল পাল্টে নিজেকে বঞ্চিত প্রমাণ করতে চাইছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের কাছে। কোন এক জাদুমন্ত্রবলে সবাইকে ম্যানেজও করে ফেলেছেন তিনি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৭ আগস্ট, ২০২৫ তারিখে জারিকৃত আদেশে উক্ত প্রকল্পে পিডি হিসেবে ড. মো. ইব্রাহিম খলিলকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই, ২০২৫ তারিখে বিএডিসির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত পত্রে পিডি হিসেবে তিনজন কর্মকর্তার নাম প্রস্তাবের পরপরই অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও নানাবিধ অভিযোগ উত্থাপন করে বেশ কিছু পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়।

উক্ত প্রতিবেদনে নীতিমালা লঙ্ঘনের বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সুরাহা করার কথাও বলা হয়েছিল। প্রতিবেদক এই অনিয়মের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক কৃষি উপদেষ্টা ও কৃষি সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদাররা সাক্ষাৎ করে দাপ্তরিক শৃঙ্খলার স্বার্থে নিয়ম লঙ্ঘন না করার বিষয়টি আমলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন।

কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়লে আমদানি ব্যয় কমবে, কাজেই কৃষি অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সেখানে এমন কারিগরি পদে যোগ্য লোককে নিয়োগ না দিয়ে পছন্দমাফিক তাবেদার নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সে জন্য ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এবং স্বেচ্ছাচারিতা পরিহার করে যোগ্য লোক নিয়োগ দিলে হয়তো সরকারের আর্থিক ক্ষতি হতো না বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প পরিচালক বিধি লঙ্ঘন করে নিয়োগ করায় উক্ত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। লীগের সুবিধাভোগী পিডি ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে চলছে রমরমা কমিশন বাণিজ্য বলে তাঁরা আরও জানান। উক্ত অভিযোগের বিষয়ে পিডি ইব্রাহিম খলিলের মোবাইলে ফোন দিলে ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *