দেড় কোটি ঘুষে ১৫ কোটি বিল: বরিশাল গণপূর্তে চলছে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের মহাজালিয়াতি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাত, জালিয়াতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের একাধিক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল অনুমোদন, বরিশাল ক্যান্সার হাসপাতালে ৫০ লাখ টাকার তামার পাইপ চুরির নাটক রটানো এবং সরকারি বদলির আদেশ অমান্য করে কর্মস্থল ফাঁকি দেওয়ার মতো নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসায় অঞ্চলজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ফয়সাল আলম টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন করে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেন। কাজ অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও দেড় কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে দুজন ঠিকাদারকে মোট ১৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধ করেন তিনি। আইনানুযায়ী এত বিপুল অঙ্কের অর্থ অগ্রিম হিসেবে পরিশোধ করার কোনো এখতিয়ার নেই। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এই বেআইনি লেনদেনের ফলে সরকারের বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি ও রাজস্ব ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

একই সঙ্গে নির্মাণাধীন বরিশাল ক্যান্সার হাসপাতালে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের তামার পাইপ চুরির সাজানো ঘটনা ঘিরেও ঘোরতর জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার নির্দেশে চুরির দাবি তুলে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আবেদনের প্রেক্ষিতে পুলিশ তদন্তে নামে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৫০ লাখ টাকার মালামাল চুরির দাবি করলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে প্রকৃতপক্ষে খুব সামান্য কিছু পাইপ চুরি হয়েছিল, যার আনুমানিক বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। পুলিশ মূল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলে আদালত তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড প্রদান করে। হাসপাতালের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত মালামাল ক্রয় না করে সেই বরাদ্দের বিপুল অর্থ আত্মসাতের চক্রান্ত বাস্তবায়নেই চুরির এই কল্পিত নাটক সাজানো হয়েছিল।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও ফয়সাল আলমের স্বেচ্ছাচারিতার নানা চিত্র ধরা পড়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও তিনি সেই প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করে চলেছেন। কার্যালয়ে উপস্থিত না হয়ে তিনি সরকারি বাসভবনে বসেই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সরকারি নথিপত্রে স্বাক্ষর করছেন। এর পাশাপাশি পদমর্যাদার অপব্যবহার করে সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজে খুলনায় যাতায়াত এবং বরিশাল গণপূর্তের শতবর্ষী ঐতিহাসিক বাংলোর আঙিনায় সরকারি নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে রাতের আঁধারে পুকুর খননের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।

এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদ হুসাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, উদ্ভূত বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *