মক্কা চুক্তির মূল দলিল প্রকাশ্যে, কী আছে এতে?

আন্তর্জাতিক ডেক্স :

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ মঙ্গলবার দেশটির সংসদে জমা দিয়েছে তুরস্ক সরকার। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ পরিস্থিতিতে আক্রান্ত দেশকে অন্য দেশগুলো সামরিক সক্ষমতাসহ পারস্পরিক সহায়তার সব উপায় কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা করবে।

গত আগস্টে স্বাক্ষরিত এ চুক্তির মাধ্যমে একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ন্যাটো জোটের চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতোই এতে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার রয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এককভাবে সংগ্রহ করেছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে কোনো সদস্য দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বা ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর সশস্ত্র হামলা হলে অন্য দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করতে বলা হয়েছে।

চুক্তির প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত হুমকি কিংবা বিপদের মুখে পড়লে সেই হুমকি দূর করতে সদস্য দেশগুলো প্রয়োজনীয় সব উপায় ব্যবহার করবে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্য কোনো দেশ বা একাধিক দেশের সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে আক্রান্ত দেশকে অবিলম্বে সহায়তা দেবে অন্য সদস্যরা।

এ ক্ষেত্রে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা প্রয়োজনের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। সদস্য দেশগুলো নিজেদের বিদ্যমান সম্পদ ও সক্ষমতার সীমার মধ্যে থেকে সহযোগিতা করবে। এর মধ্যে সামরিক উপায় ও সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বীকৃত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করাও এ ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রতিরক্ষা শিল্প ও গোয়েন্দা সহযোগিতা

১৬টি অনুচ্ছেদে গঠিত চুক্তিতে শুধু পারস্পরিক সামরিক সহায়তার অঙ্গীকার নয়, প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ও রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়াবে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামরিক সরঞ্জাম যৌথভাবে উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থাও থাকবে।

যুদ্ধ ও শান্তিকাল—উভয় সময়েই দেশগুলো সামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক বিনিময়, যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়ার আয়োজন করতে পারবে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানো।

চুক্তিতে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, এমন সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তিন দেশ সহযোগিতা করবে।

এ ছাড়া পারস্পরিক সম্মত নিরাপদ মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে দেশগুলো। এ ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত উপাত্তের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

সদস্যদেশগুলো শান্তিকাল, যুদ্ধকাল ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে পরস্পরকে অস্ত্র, গোলাবারুদ, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে। তবে এ সহযোগিতা নির্ভর করবে সরবরাহব্যবস্থার প্রাপ্যতা ও সামঞ্জস্যের ওপর।

কৌশলগত প্রতিরক্ষা কমিটি

চুক্তির অষ্টম অনুচ্ছেদে ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন।

কমিটির দায়িত্ব হবে যৌথ প্রতিরক্ষার কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেওয়া, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পথে তৈরি হওয়া প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

কমিটি বছরে দুবার বৈঠক করবে। পালাক্রমে তিন দেশের একেকটি দেশ বৈঠকের আয়োজন করবে। প্রয়োজন মনে করলে দেশগুলোর নেতারা বছরে একবার বৈঠক করতে পারবেন।

মূল তিন দেশের সর্বসম্মতিতে এ চুক্তিতে অন্য দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার নিয়ম ও নীতিও নির্ধারণ করতে পারবে কমিটি।

চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর মহাসচিব তিন দেশের মধ্য থেকে পালাক্রমে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। প্রথম মহাসচিব হবেন পাকিস্তানের নাগরিক।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *