ঔষধ প্রশাসনের ‘আলাদিনের প্রদীপ’ সৈকত কুমার কর: জিম্মি দেশের ওষুধ খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশের কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তাকে ঘিরে উঠে এসেছে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য, পদায়ন সিন্ডিকেট এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিস্তর অভিযোগ। স্বাস্থ্যের মতো এমন একটি স্পর্শকাতর খাতকে জিম্মি করে গড়ে ওঠা দুর্নীতির এই জাল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা অবিলম্বে এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মূল কাজই হলো সাধারণ মানুষের কাছে নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্পন্ন ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু সংস্থাটির ভেতর দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে সেই মূল লক্ষ্যই এখন প্রশ্নের মুখে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১২ সালে চাকরিতে যোগদানের পর দীর্ঘ ১৪ বছরের চাকরিজীবনে প্রায় পুরো সময় প্রধান কার্যালয়কে কেন্দ্র করেই প্রভাব বিস্তার করে আছেন উপপরিচালক সৈকত কুমার কর। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক পরিবর্তন কিংবা বদলির ঝড় উঠলেও তার অবস্থানে কোনো নড়চড় হয়নি। এর ফলে অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে তার একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। জেলা পর্যায়ের যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তারা যখন কাঙ্ক্ষিত পদায়ন এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তখন সৈকত কুমার কর একাধিকবার বিদেশ প্রশিক্ষণসহ নানা সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওষুধ পরীক্ষার পরিসংখ্যানে। এ সময়ে ন্যাশনাল ড্রাগ কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি (এনডিসিএল) ৭৭টি ওষুধকে মানহীন ঘোষণা করে। মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যেখানে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেখানে লক্ষ্য করা গেছে রহস্যজনক ধীরগতি। অভিযোগ রয়েছে, সৈকত কুমার করের নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী চক্রের অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে বেশ কিছু অপরাধী ও প্রভাবশালী ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা থেকে রেহাই পেয়ে গেছে।

শুধু ভেজাল ওষুধ নয়, আমদানির অনুমোদন ও এনওসি বাণিজ্যেও তার নাম জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। ফুড সাপ্লিমেন্ট ও নিউট্রিশনাল সাপ্লিমেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে অতীতে নিবন্ধনবিহীন পণ্যের জন্য অনাপত্তিপত্র প্রদান করার প্রমাণ মিলেছে, যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আগেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া অ্যালোপ্যাথিক ও ইউনানী ওষুধের উৎপাদন লাইসেন্স প্রদান, মোড়ক অনুমোদন, ওষুধের মূল্য নির্ধারণ, মেডিকেল ডিভাইস নিবন্ধন, কাঁচামালের সোর্স ভ্যালিডেশন এবং আমদানি অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ফাইল আটকে রেখে মোটা অঙ্কের আর্থিক অনিয়ম করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এই উপপরিচালকের বিরুদ্ধে।

সংস্থাটির ভেতরের একাধিক সূত্র জানায়, নিয়োগ ও পদায়ন বাণিজ্য ছিল এই চক্রের আয়ের বড় উৎস। গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে বদলি ও পছন্দের স্থানে পদায়নের জন্য লাখ লাখ টাকার লেনদেন হতো এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এমনকি ২০২৫ সালের ৩ জুন প্রকাশিত ৭৪ জনের একটি নিয়োগ আদেশকে ঘিরে ব্যাপক জালিয়াতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে বেশ কয়েকজন প্রার্থীকে অবৈধ পন্থায় চাকরি নিশ্চিত করেছিলেন সৈকত কুমার কর।

চাকরিতে থেকে অর্জিত এসব অনৈতিক আয় দিয়ে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর অভিজাত বিভিন্ন এলাকায় নিজের ও নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, জমি ও বিপুল অঙ্কের নগদ অর্থের মালিক হয়েছেন তিনি। শুধু ঢাকাতেই নয়, তার জন্মস্থান কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে প্রচুর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। দুস্থ ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খাতের টাকা লুটপাট করে এই বিপুল সম্পদের উৎস কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সেবা প্রার্থীরা।

স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসে এ ধরনের দুর্নীতি চরম উদ্বেগজনক। সাধারণ মানুষের আস্থা রক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত দল গঠন করা জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ কোটি মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *