নিজস্ব প্রতিবেদক :
বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডে (মিল্ক ভিটা) দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। পর্ষদ নির্বাচনে পরিচালক পদে জিতিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়া, খামারে কেনাকাটায় অনিয়ম এবং মৃত প্রাণীর চিকিৎসার নামে অর্থ ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে একটি বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে। এসব অভিযোগের নেপথ্যে প্রতিষ্ঠানটির সমবায় সমিতি বিভাগের ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও চিকিৎসক ড. আক্তার হোসেন নোবেলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন জেতানোর আশ্বাসে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা কমিটির ‘নির্বাচন-২০২৫’-এ পরিচালক পদে বিজয়ী করার আশ্বাস দিয়ে বেলটিয়া প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি মুক্তার খানের কাছ থেকে ১০ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করা লিখিত অভিযোগে মুক্তার খান জানান, তাঁকে পরিচালক পদে জিতিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ড. আক্তার হোসেন নোবেল ২০ লাখ টাকার চুক্তি করেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, চুক্তির অংশ হিসেবে গত ২৫ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তেজগাঁওয়ের নাক-কান-গলা হাসপাতালের সামনে ড. নোবেলের সরকারি গাড়িতে নগদ ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। টাকা হস্তান্তরের সময় খাওনা দরগা সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আফজাল হোসেন মাস্টার উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আরও ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে নির্বাচন স্থগিত হলে মুক্তার খান টাকা ফেরত চান। তবে ড. নোবেল ওই অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
খামারে চিকিৎসা ও মালামাল কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ
মিল্ক ভিটার সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীঘাট দুগ্ধ কারখানার অধীন ‘টেকেরহাট মহিষ খামারে’ খড় কেনা, পশুখাদ্য ও চিকিৎসা খাতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করেছে তিন সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি। উপব্যবস্থাপক বিদুর কুমার ঘোষের নেতৃত্বে পরিচালিত তদন্তে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৃত বাছুরের চিকিৎসা দেখানোর তথ্য
তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, ড. আক্তার হোসেনের দায়িত্বকালীন ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চিকিৎসার কাগজপত্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। একটি বাছুরের (ট্যাগ নম্বর-৭৫৫) মৃত্যু হয় ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই। অথচ রেজিস্টারে ওই বাছুরের চিকিৎসা ২০১৯ সালের ২ মে পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় নয় মাস পরও তার চিকিৎসার তথ্য নথিভুক্ত ছিল।
এ ছাড়া একটি বাছুরের চিকিৎসায় একই সঙ্গে ৫৮ ভায়াল ‘Ciprofloxacin’ ব্যবহারের তথ্য এবং নাম উল্লেখ না করে একাধিক গাভী ও বাছুরের চিকিৎসার নামে অর্থ ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাল রেজিস্টার ও নথিতে কারসাজির অভিযোগ
তদন্তে মূল রেজিস্টারের পাশাপাশি পৃথক ডুপ্লিকেট গেট এন্ট্রি রেজিস্টার ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীর স্বাক্ষর ছাড়াই হাজার হাজার কেজি খড় খামারে প্রবেশের হিসাব দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া স্টক রেজিস্টারের তথ্য কেটে পরিবর্তন এবং আঠা দিয়ে ছেঁড়া পাতা জোড়া লাগিয়ে মজুতের হিসাব দেখানোর তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ঘাস কেনা ও ওষুধের বিলে অনিয়ম
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘নন্দি ফার্মেসি’ নামের একটি দোকান থেকে ৫০ হাজার টাকার ঘাস কেনার হিসাব দেখানো হয়েছে, যা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কাল্পনিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকার ওষুধ কেনা হলেও নথিতে ৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয় দেখানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এ হিসাবে ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকার ব্যবধান রয়েছে।
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি সাধনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ভুয়া ভাউচার তৈরি ও নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সমবায় সদস্য ও নেতারা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।