বন উজাড় থেকে বদলি-বাণিজ্য লামার ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রাম বনাঞ্চলের বান্দরবানের লামা বন বিভাগে চলছে অবৈধ অর্থ ও গাছ কেটে পাচারের হিড়িক। নিয়মের তোয়াক্কা না করে হরহামেশাই চলছে গাছ কাটা ও জবরদখলের রাজত্ব। এ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান অধীনস্থ একাধিক অসাধু বন কর্মকর্তার যোগসাজশে বেপরোয়া লুটপাটের কারণে অবৈধ দখলদারত্ব থেকে অভিনব কায়দায় পাল্টে যাচ্ছে বনের নাম। যেন দুর্নীতির শীর্ষে উঠছে লামা বন বিভাগ। ফলে প্রতিদিনই লাখ লাখ টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বন বিভাগ তথা সরকার।

জানা গেছে, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই উঠেছে বন উজাড়, জোত ও ট্রানজিট পারমিটের আড়ালে গাছ পাচার, বদলি-পদায়নে অনৈতিক অর্থ লেনদেন, বিভিন্ন চেকস্টেশনে মাসোহারা আদায় এবং বনায়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থের অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ। এসব অভিযোগের তীর লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে রহস্যজনক কারণে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ-বাণিজ্য দেখেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে। লামা বন বিভাগে বনাঞ্চল ধ্বংস, অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি, গাছ কাটা কিংবা বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ নানা দুর্নীতি ও বদলি-বাণিজ্য নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তিনি। একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন নিষ্ক্রিয়তা ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ের কারণে বন কর্মকর্তারা বনজ সম্পদ উজাড়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে জানান বন-সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ফরেস্টার রনি পারভেজকে বন বিভাগে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে আরও ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আব্দুল মালেক নামে এক রেঞ্জারকে লামা সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জোত পারমিট অনুমোদন থেকে শুরু করে রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে পদায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তো আছেই।

অভিযোগ অনুযায়ী, রনি পারভেজ বর্তমানে লামা বন আদালনের এফসিসিও, বমুবিলছড়ি বিট, বিশেষ টহল দল, লামা রেঞ্জ ও লামামুখ চেকস্টেশনের দায়িত্বে রয়েছেন। একই ব্যক্তির হাতে একসঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকায় বনাঞ্চল থেকে অবৈধভাবে গাছ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচারের সুযোগ করে দেওয়া এবং লাকড়ি পোড়ানো ইটভাটা থেকে ৫ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়েছেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান। ফার্নিচার পরিবহনের অনুমোদনের নামে ১ হাজার টাকা আদায়ের মতো অনৈতিক বা অবৈধ কর্মকাণ্ডও চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

ইটভাটার মালিকরা অভিযোগ করেন, লামা বন বিভাগের আওতাধীন লাকড়ি পোড়ানো ৪০টি ইটভাটা থেকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং মাসে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে। টাকা না দিলে ভাটায় কিনে আনা লাকড়ি জব্দ ও বারবার অভিযান পরিচালনা করেন ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ৮০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বিপরীতে বাস্তবে মাত্র ৩০ হেক্টর বাগান করা হয়েছে। বাকি ৫০ হেক্টরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলেও দাবি করেছেন বন-সংশ্লিষ্টরা। ডলুছড়ি রেঞ্জ নিয়েও রয়েছে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের নানা অভিযোগ।

এদিকে, বর্ষা মৌসুমে বাঁশ কাটা ও পরিবহন বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও লামা বন বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা বাঁশ কাটা ও পরিবহনের জন্য মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে টিপি (পরিবহন পাশ) দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বাঁশে ডিএফও ৫ টাকা করে নেন। কাগজে-কলমে মাতামুহুরি সংরক্ষিত বনের বাঁশ মহাল বন্ধ থাকলেও রাতে বিপুল পরিমাণ বাঁশ ভুয়া টিপি দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে। তাতেও আলাদা টাকা নেন ডিএফও।

ডিএফওর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লামা বন বিভাগের ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোত। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ওই জোতে সেগুন ও গামারীসহ মোট ২ হাজার ৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৪২২টি সেগুন ও ২৩৮টি গামারী গাছ রয়েছে। এসব গাছের বিপরীতে সেগুনের প্রায় ১৮ হাজার ঘনফুট এবং গামারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঘনফুট কাঠের সাইজলিস্ট অনুমোদন দেওয়া হয়।

নথি অনুযায়ী, ২ হাজার ৩৮৮টি গাছের সাইজলিস্টের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহনের জন্য প্রায় ৪৮টি ট্রানজিট পারমিট (টিপি) নেওয়া হয়েছে লামা বন বিভাগ থেকে।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, বিভিন্ন বেকারিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের কথিত অনিয়মের ক্ষেত্রে ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন ও ফরেস্টার রনি পারভেজ ক্যাশিয়ারের ভূমিকায় রয়েছেন বলেও অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আলতাফ হোসেন প্রায় দেড় বছর লামার চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনের পর প্রায় আট মাস আগে ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন ফাইতং সড়কটি কাঠ চোরাকারবারিদের কাছে মাসিক চুক্তিতে অঘোষিতভাবে লিজ দিয়েছেন। এর ফলে ওই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন সেগুন, গর্জনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ পাচার হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আলতাফের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দাবি, জোত ও ট্রানজিট পারমিটের আড়ালে বনাঞ্চলের গাছ পাচারের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে বিশেষ টহল দলের ওসি ফরেস্টার রনি পারভেজ সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ। এর আগে লামা বন বিভাগে জোত পারমিট ও ট্রানজিট পারমিট ব্যবহার করে বন উজাড়ের অভিযোগ নিয়ে তদন্তের আদেশ হলেও তা মাঝপথে থেমে যায় বলে জানা যায়।

আরও জানা যায়, লামা বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জে প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক জোত অনুমোদন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব জোত থেকে কাঠ পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে ৪০ টাকা করে ডিএফও মোস্তাফিজের নামে আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। এছাড়া লামা বন বিভাগের সদর রেঞ্জের ট্রানজিট পারমিট (টিপি চলাচল পাশ) শাখায় গত প্রায় ১০ বছর ধরে মো. সেলিম নামে একজন দায়িত্ব পালন করছেন।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, লামা বন বিভাগে প্রতি মাসে আড়াই শতাধিক ট্রানজিট পারমিট (টিপি) পাশ হয়। প্রতিটি টিপির বিপরীতে ১০ হাজার টাকা করে ডিএফওর জন্য আদায় করেন সেলিম, এমন অভিযোগও রয়েছে। সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসের ট্রানজিট পারমিট (টিপি) শাখায় সরকারি কর্মচারীর পরিবর্তে একজন বেসরকারি ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন দায়িত্বে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ আদায়ের বাইরে কথিতভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলকে ঘনফুটপ্রতি পাঁচ টাকা দেওয়ার একটি বিষয় স্থানীয় পর্যায়ে প্রচলিত রয়েছে। লামা বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ, বিট ও চেকস্টেশনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টিং ও বদলিতেও লাখ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ডিএফও মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্টরা বলেন, পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন পেতে অর্থ দিতে হয় ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানকে। তবে এ অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে।

অভিযোগ রয়েছে, লামা বন বিভাগে ছয়জন আউটসোর্সিং কর্মচারী রয়েছেন। তাদের প্রত্যেককে সরকারিভাবে প্রায় ১৮ হাজার টাকা করে মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি কাজে ব্যবহার না করে এসব আউটসোর্সিং কর্মচারীকে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলে তার নম্বরে সংযোগ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে জানার জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক সিএফ মিহির কুমার দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গাড়িতে আছেন বলে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে কল কেটে দেন।

এদিকে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট জোত পারমিট, ট্রানজিট পারমিট, বনায়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও ব্যয়ের নথি, পোস্টিং-বদলির আদেশ, টিপি শাখার রেকর্ড এবং বিভিন্ন চেকস্টেশনের আদায়সংক্রান্ত হিসাব নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং সরকারি অর্থের লুটপাট বন্ধে পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও জানিয়েছেন বন-সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *