থাইরয়েড ক্যানসার কেন হয়, কারা বেশি ঝুঁকিতে? জানুন লক্ষণ ও চিকিৎসা

নিজস্ব প্রতিবেদক:

থাইরয়েড ক্যানসার হলো থাইরয়েড গ্রন্থির কোষে তৈরি হওয়া ক্যানসার। ঘাড়ের সামনের নিচের অংশে, অ্যাডামস অ্যাপলের নিচে প্রজাপতির মতো আকৃতির এই গ্রন্থি থাকে। এটি থাইরয়েড হরমোন তৈরি করে, যা শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ও বিপাক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

থাইরয়েড গ্রন্থিতে প্রধানত ফলিকুলার ও সি কোষ থাকে। ফলিকুলার কোষ রক্তের আয়োডিন ব্যবহার করে থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে সহায়তা করে। আর সি কোষ ক্যালসিটোনিন তৈরি করে, যা শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। থাইরয়েড ক্যানসারের প্রধান চার ধরন হলো প্যাপিলারি, ফলিকুলার, মেডুলারি ও অ্যানাপ্লাস্টিক ক্যানসার।

যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে

প্রাথমিক পর্যায়ে থাইরয়েড ক্যানসারের তেমন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে ঘাড়ের নিচের অংশে পিণ্ড বা গলদ অনুভূত হওয়া, গলার চারপাশে ফোলা, গলা ব্যথা এবং গিলতে অসুবিধা বা ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কেন হয় থাইরয়েড ক্যানসার

থাইরয়েড ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। তবে পারিবারিক ইতিহাস, কিছু জেনেটিক পরিবর্তন, বিকিরণের সংস্পর্শ এবং আয়োডিনের ঘাটতিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে শৈশবে অতিরিক্ত বিকিরণের সংস্পর্শ পরবর্তী জীবনে থাইরয়েড ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পরিবারের নিকটাত্মীয়ের এ রোগের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কতটি পর্যায়

ক্যানসার কতটা ছড়িয়েছে এবং টিউমারের আকার ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে থাইরয়েড ক্যানসারের পর্যায় নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার থাইরয়েড গ্রন্থির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে এটি আশপাশের লিম্ফ নোড বা ঘাড়ের টিস্যুতে ছড়াতে পারে। চতুর্থ পর্যায়ে ক্যানসার ফুসফুস বা হাড়ের মতো শরীরের দূরের অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কীভাবে শনাক্ত করা হয়

 

প্রথমে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, থাইরয়েড টিস্যুর বায়োপসি এবং জেনেটিক পরীক্ষা করা হতে পারে। বায়োপসিতে থাইরয়েড থেকে সামান্য টিস্যু নিয়ে পরীক্ষাগারে মাইক্রোস্কোপের নিচে পরীক্ষা করা হয়। সব রোগীর ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।

চিকিৎসা কী

থাইরয়েড ক্যানসারের চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যানসারের ধরন, পর্যায় ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর। সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার। প্রয়োজনে থাইরয়েড গ্রন্থির সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া তেজস্ক্রিয় আয়োডিন থেরাপি, বিকিরণ চিকিৎসা, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হতে পারে।

থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণের পর শরীরে প্রয়োজনীয় হরমোনের ঘাটতি পূরণে আজীবন থাইরয়েড হরমোন গ্রহণ করতে হতে পারে। এর মাত্রা নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

নিরাময় সম্ভব কিনা

 

বেশিরভাগ থাইরয়েড ক্যানসার, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে, সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব। প্যাপিলারি থাইরয়েড ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ ধরন এবং সাধারণত এর চিকিৎসার ফল ভালো হয়। তবে মেডুলারি ও অ্যানাপ্লাস্টিক ধরনের ক্যানসার তুলনামূলকভাবে বেশি জটিল।

পুরুষদের কি থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে?

হ্যাঁ, পুরুষদেরও থাইরয়েড ক্যান্সার হতে পারে। তবে নারীদের মধ্যে এ রোগের ঝুঁকি বেশি। নারীদের সাধারণত ৪০–৫০ বছর এবং পুরুষদের ৬০–৭০ বছর বয়সে এ রোগ বেশি দেখা যায়।

থাইরয়েড গ্রন্থি ছাড়া কি বাঁচা যায়?

হ্যাঁ, থাইরয়েড গ্রন্থি অপসারণের পরও বাঁচা সম্ভব। তবে শরীরে হরমোনের ঘাটতি পূরণে আজীবন থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ নিতে হয়। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে ওষুধের মাত্রা ঠিক রাখতে হয়।

থাইরয়েড ক্যানসারের কারণে সরাসরি মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা সাধারণ লক্ষণ নয়। তবে হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন বা ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে এসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই ঘাড়ে অস্বাভাবিক গলদ, ফোলা বা দীর্ঘস্থায়ী গলা-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *