সাজ্জাদের বিরুদ্ধে নারী আটকে রেখে নির্যাতন, দেহব্যবসা পরিচালনা ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিজেকে কে দেন ডিবি পরিচয়

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে একাধিক আবাসিক হোটেলকে ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ সব অভিযোগ। নারী দিয়ে দেহব্যবসা, মাদক ব্যবসা, নারীকে জিম্মি করে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং বিভিন্ন স্থানে নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার—এসব গুরুতর অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ-এর নাম।
স্থানীয় সূত্র ও কয়েকজন ভুক্তভোগীর দাবি, যাত্রাবাড়ীর একাধিক আবাসিক হোটেলের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ কিংবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সাজ্জাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—হোটেল প্রজাপতি, হোটেল প্রাইম, হোটেল স্বাগতম, হোটেল রংধনু, হোটেল প্যারাডাইস, হোটেল হেভেন, হোটেল প্যালেস, হোটেল মুন, হোটেল রোজভিউ ও ফেইস ইন। এছাড়া আরও কয়েকটি আবাসিক হোটেলের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব হোটেলের কোনো কোনোটি ব্যবহার করে নারীদের যৌন শোষণের দিকে ঠেলে দেওয়া, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং অসহায় নারীদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটে থাকে।চাকরির প্রলোভন, এরপর তিন মাস আটকে রাখার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নারীর দাবি, পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে ঢাকায় এসে গার্মেন্টসে চাকরি নেন তিনি। যাতায়াতের পথে সাজ্জাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে তাকে যাত্রাবাড়ীর একটি রেস্টুরেন্টে ডেকে নেওয়া হয়।
ওই নারীর অভিযোগ, এরপর কৌশলে তাকে প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয়। এ সময় তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। অনিচ্ছা প্রকাশ করলে মারধর করা হতো বলেও দাবি করেন তিনি।
একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে পালিয়ে যান ওই নারী। পরে নিরাপত্তার জন্য সৌদি আরবে চলে যান বলে জানান তিনি।
সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে সেলিমের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
আরেক ভুক্তভোগী সেলিমের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সাজ্জাদের সঙ্গে থাকার কারণে মাদক ও বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এতে তার নিজের পাশাপাশি পরিবারের জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সেলিমের দাবি, প্রায় এক বছর আগে সাজ্জাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে তিনি যাত্রাবাড়ী থানায় যান। অভিযোগ করতে যাওয়ার বিষয়টি থানা থেকে সাজ্জাদকে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয় বলেও দাবি তার।
এরপর সেলিমের অভিযোগ, রাতে যাত্রাবাড়ীর মাছের আড়ত এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরে প্রায় তিন দিন না খাইয়ে রাখা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
হোটেল থেকে মাসে ৭০ হাজার টাকা ‘মাসোহারা’?
যাত্রাবাড়ী থানার আওতাধীন বিভিন্ন আবাসিক হোটেল থেকে প্রতি মাসে থানার ওসিকে ৭০ হাজার টাকা করে ‘মাসোহারা’ দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একাধিক সূত্র।অভিযোগটি সত্য হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। কার মাধ্যমে টাকা আদায় হয়, কোথায় জমা হয় এবং কার কাছে পৌঁছায়—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

শুধু সাজ্জাদ নয়, আড়ালে আরও কারা জরিত?

অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যাত্রাবাড়ীর এসব আবাসিক হোটেলের মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে আল-আমিন, তারামিয়া, গনিসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করছেন।
তাদের কেউ কেউ একটি কথিত ‘মাফিয়া-চক্র’ বা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন—সাজ্জাদ কি ডিবির লোক?
সাজ্জাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—তিনি বিভিন্ন স্থানে নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।
তিনি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ পুলিশের কোনো সদস্য কি না, ডিবির সঙ্গে তার কোনো বৈধ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না কিংবা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে থাকলে এর পেছনে উদ্দেশ্য কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
দণ্ডবিধির ১৭০ ধারায় প্রকৃত সরকারি কর্মকর্তা না হয়েও সরকারি কর্মকর্তার পরিচয় ধারণ করে সেই পরিচয়ের ভিত্তিতে কাজ করার বিষয়ে শাস্তির বিধান রয়েছে।
মানব পাচার আইনের আওতায় আসতে পারে অভিযোগ
অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে ঘটনার ধরন অনুযায়ী মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
ভয়ভীতি, বলপ্রয়োগ, প্রতারণা বা কোনো ব্যক্তির অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে যৌন শোষণসহ বিভিন্ন শোষণের উদ্দেশ্যে কাউকে আটক, স্থানান্তর বা আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো তদন্তে বিবেচনায় আসতে পারে।
সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইনের আরও কঠোর বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে নারীকে প্রতারণা, বলপ্রয়োগ বা প্রলোভনের মাধ্যমে যৌন শোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে স্থানান্তর বা দখলে রাখার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
তিন দিন আটকে রাখার অভিযোগও গুরুতর
কোনো ব্যক্তিকে বেআইনিভাবে আটক রাখা বা মারধরের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঘটনার ধরন অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৪২, ৩৪৩ বা ৩৪৪ ধারাসহ অন্যান্য বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
বিশেষ করে কাউকে তিন দিন বা তার বেশি সময় বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৩৪৩ ধারার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
হোটেলগুলোর সিসিটিভি ও আর্থিক নথি খুলতে পারে রহস্য
যাত্রাবাড়ীর এসব আবাসিক হোটেল ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে শুধু মৌখিক বক্তব্য নয়, হোটেলের প্রকৃত মালিকানা, ট্রেড লাইসেন্স, ভাড়ার চুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ, অতিথি নিবন্ধন, কর্মচারীদের তথ্য, মোবাইল যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের নথি খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে কথিত মাসোহারা, হোটেল পরিচালনায় কারা যুক্ত এবং সাজ্জাদের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সম্পর্ক কী—এসব তথ্য তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
একাধিক আবাসিক হোটেলকে কেন্দ্র করে যদি নারীকে জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন শোষণের শিকার করা, মাদক ব্যবসা, বেআইনিভাবে আটকে রাখা কিংবা পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের মতো ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অভিযোগকারীরা বিষয়গুলো তদন্তে যাত্রাবাড়ী থানা, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডিএমপি সদর দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ এবং প্রতিবেদনে উল্লেখিত অন্যান্য ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *