নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কিসমত-জাফরাবাদ আবাসন প্লট প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১৫ সালের জুলাই মাসে। কিন্তু ১১ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনো সম্পন্ন হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের যোগসাজশে শুরুতে মাটি ভরাট না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। একের পর এক দুর্নীতির কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।
প্রকল্পের আওতায় ১৬ দশমিক ২৮ একর জমিতে ৪ হাজার ২৩৭ দশমিক ২১ লাখ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে জুলাই ২০১৫ থেকে জুন ২০১৭ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি অনুমোদিত হয়। কিন্তু ২০২৬ সালেও কাজ শেষ হয়নি। তথ্য গোপন করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ৫ হাজার ৬৫০ দশমিক ০৯ লাখ টাকার সংশোধিত আরআরডিপিপি অনুমোদন করা হয়েছে। ফলে সরকারের অতিরিক্ত ১ হাজার ৪৪২ দশমিক ৮৮ লাখ টাকা আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারির পত্র অনুযায়ী, প্রকল্পের মাটি ভরাট কাজে নিয়োজিত তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান প্রকল্পের স্থানে মাটি ভরাট না করে ২ কোটি টাকার ভুয়া বিল দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
দুদকের অনুসন্ধানী তদন্ত ও এলজিইডির সহায়তায় মাটি ভরাটের পরিমাণ নির্ণয় করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চারজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। দুদক প্রধান কার্যালয়ের সুপারিশে তিন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আদালতে ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি এখনো চলমান।
দুদকের তদন্ত ও আইএমইডিপির বিরূপ মন্তব্যের বিষয়টি গোপন রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন উপদেষ্টার কাছে আরডিপিপি অনুমোদন করানোর অভিযোগও রয়েছে। ওই আরআরডিপিপিতে অতিরিক্ত বিলের অর্থ ফেরত আনার কোনো নির্দেশনা ছাড়াই চুরি করা মাটির পরিমাণ নতুন কাজে অন্তর্ভুক্ত করে একই কাজে দুইবার অর্থ খরচের পথ সুগম করা হয়েছে বলে অভিযোগ।ঘটনার প্রায় ১১ বছর পার হলেও প্রকল্পের কোনো অংশে এখনো মাটি ভরাট করা হয়নি। অথচ রহস্যজনক কারণে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে প্রকল্পের প্লট বরাদ্দপ্রাপক ১১৫টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা এখনো প্লট বুঝে পাননি। জড়িতরা প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রয়যোগ্য প্রতি কাঠা জমির মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা বাড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পে মাটি ভরাট না হওয়ায় বারবার অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, টানা ১১ বছরেও প্রকল্পের সমাপ্তি না ঘটিয়ে ১৪ কোটি ১২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে ১ কোটি ৯৯ লাখ ৬৬ হাজার ১৬ দশমিক ৩০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই কাজ পুনরায় করার কারণে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সর্বশেষ তফসিল-২০২২ (২য় সংশোধনী) অনুযায়ী ৪৩ হাজার ৯৬৩ দশমিক ৫৩ ঘনমিটার মাটি ভরাট বাবদ অতিরিক্ত ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭২ হাজার ৬৪৯ টাকা ব্যয় হবে।সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে এবং সন্দেহভাজনদের তদন্ত করে শাস্তির আওতায় না আনলে সর্বমোট ১৯ কোটি ৪২ লাখ ২৬ হাজার ৬৬৫ দশমিক ৩০ টাকা সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, যা প্রকল্পের বরাদ্দ প্রাপকদেরই বহন করতে হবে।দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তিন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা থাকার পরও উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অলিউর ইসলামকে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিসমত-জাফরাবাদ প্রকল্প কেলেঙ্কারির মূল কারিগর অলিউল ইসলাম মন্ত্রণালয়ে অনিয়মের কথা গোপন রেখে আরডিপিপি অনুমোদন করেন। এ কাজে কাওসার মোর্শেদও জড়িত।
দুদক মামলা দায়ের করায় অলিউল ইসলাম তার অপকর্ম ধামাচাপা দিতে প্রকল্প পরিচালকের স্মারক নং-২০১, তারিখ ১৮-৮-২০২৬-এ মাটি ভরাটের কাজ শুরু করার জন্য দুদকে চিঠি দেন (দুদক স্মারক নং-২৩৬২, তারিখ ২৫ আগস্ট ২০২৬)। মূলত প্রকল্প পরিচালককে পরিষ্কারভাবে ২ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এর নেপথ্যে আছেন গোপালগঞ্জের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান পলাশ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম এবং মিরপুর গৃহসংস্থার বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ। শাস্তির পরিবর্তে তারা প্রাইজ পোস্টিং ভাগিয়ে নিয়েছেন। আশরাফুজ্জামান পলাশ খুলনায় পদায়ন পেয়ে ‘রাজারহালে’ দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর সেগুনবাগিচায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় থেকে চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান হয়েছেন পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও প্রশাসন) আজিজ হায়দার ভূঁইয়া। অন্যদিকে দুদকে পৃথক তিনটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। এরপরও অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। তাদের ‘খুঁটির জোর’ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মামলার আসামি হয়েও পদোন্নতি
দুর্নীতির মামলার মূল অভিযুক্ত এই কর্মকর্তারা বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন ও প্রমোশনাল বদলি পেয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার তদন্ত চলমান থাকা অবস্থাতেই জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) এই কর্মকর্তাদের বড় বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত চট্টগ্রামের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদকে শাস্তি দেওয়ার বদলে উল্টো ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্পসহ ঢাকার প্রায় ১২০০ কোটি টাকার দুটি বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও তাকে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ের পরিকল্পনা ও ডিজাইন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কর্তৃপক্ষের শীর্ষ প্রশাসনের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে কাজ করছেন এবং তার বিরুদ্ধে নতুন করে বিভিন্ন অভিযোগও উঠেছে।বহাল তবিয়তে রয়েছেন মামলার আরেক আসামি উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামানও।
মামলা দায়েরের পর দুদকের পক্ষ থেকে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ তা অমান্য করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রেখেছে, যা নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বর্তমান সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েও। এ ঘটনায় দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক ইমরান খান অপুর অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা (মামলা নং-০১, তারিখ: ২৭/০২/২০২৫) দায়ের করা হয়। মামলায় অভিযুক্ত আসামিরা হলেন, সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদ, সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ অলিউল ইসলাম, উপসহকারী প্রকৌশলী আশরাফুজ্জামান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক কন্সট্রাকশন প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট এন্ড মেসার্স ইউটি মং জেভির পার্টনার ইনচার্জ মাঈনুল কবির।অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৯ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী কর্তৃক চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার কিসমত জাফরাবাদ মৌজায় ‘সাইট এন্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। পুরো প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৪২ কোটি ৩৭ লক্ষ ২১ হাজার টাকা। এর মধ্যে প্রকল্পের মাটি ভরাট, আরসিসি রাস্তা, ড্রেন ও কালভার্ট নির্মাণ কাজের জন্য ৭ কোটি ৫৬ লক্ষ ৩২,৭৯৮ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।মাটি ভরাটের কাজ পায় যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স হক কনস্ট্রাকশন প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট এন্ড মেসার্স ইউটি মং জেভি’। কাজ শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৮৭,০৯৩.১৬ ঘন মিটার মাটি ভরাটের দাবি করে মোট ১,৯৯,৬৬,০১৬.৩ টাকার বিল দাখিল করে। ভ্যাট, আইটি ও জামানত বাদে তাদের ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৭৬,৬১৪ টাকা পরিশোধও করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ।এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম বলেন, ওই প্রকল্প সম্পর্কে তার জানা ছিল না। এরপরও তিনি খোঁজখবর নিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।