ডিপিডিসির ৩০ লাখ টাকার বাজেটে তদন্তের আলামত গায়েবের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) এর মাতুয়াইল এনওসিএস কার্যালয়কে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এখন নতুন মোড় নিয়েছে। ঘুষ বাণিজ্য, মিটার কারসাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত শুরু হতেই এবার সামনে এসেছে আরও গুরুতর অভিযোগ-ডিজিটাল আলামত গোপন, তথ্য পরিবর্তন এবং তদন্তকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা।

অভিযোগকারীর দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট তদন্তের আগেই নিজেদের বিরুদ্ধে থাকা তথ্য-প্রমাণ মুছে ফেলতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ কমিটি নির্ধারিত সময়ে তদন্তকাজ শুরু করেনি। তারা দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের আলামত নষ্ট করতে সময় দিয়েছেন বলে সূত্র জানায়। সম্প্রতি এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগে বলা হয়, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্রে উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার, মো. মঞ্জুরুল কাদের, লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু এবং ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়াসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, নতুন সংযোগ, লোড বৃদ্ধি, মিটার পরিবর্তন, বিল সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবায় গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায় করা হতো। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল আটকে রাখা, অযথা হয়রানি এবং সেবা বিলম্বিত করার অভিযোগও রয়েছে।

এ ব্যাপারে তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করলে বিদ্যুৎ বিভাগ উপসচিব মো. আবু লাইছের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে রয়েছেন পিডিবির উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. বনি আমিন এবং ডিপিডিসির ম্যানেজার (আইসিটি) মো. হেলাল উদ্দিন।

তদন্ত শুরুর পরই অভিযোগ ওঠে, মাতুয়াইল ডিভিশনের আইসিটি শাখার লাইনম্যান মেট মো. ফিরোজ শেখ (পরিচিতি নম্বর-২১২৮৩)-এর সহায়তায় বিভিন্ন বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং, সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্য এবং ডিজিটাল লগ পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগকারী বলছেন, এসব তথ্য পরিবর্তন করা হলে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে মো. ফিরোজ শেখের সঙ্গে ৫ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর গুলশান ও ধানমন্ডি এলাকায় একাধিক গোপন বৈঠকে তদন্তের গতিপথ নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি তদন্তকে প্রভাবিত করতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে একমত নন লাইনম্যান মেট মো. ফিরোজ শেখ। তিনি বলেন, ‘নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল স্যার আমার অভিভাবকের মতো। তাঁর নির্দেশ আমি শুনব, এটা তো স্বাভাবিক। স্যারের পাশে সব সময় আছি, থাকব।’

অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের একাধিক বক্তব্যে একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, ডিপিডিসির এই কার্যালয়ে নিয়মের চেয়ে প্রভাব ও অর্থের মূল্য বেশি। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন করেও অনেক গ্রাহক মাসের পর মাস সেবা পান না। অথচ অবৈধ অর্থ দিলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়—এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক গ্রাহক।

এদিকে তদন্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় রহমান ব্যাপারী। তাঁর আশঙ্কা, সার্ভার, মিটার ডাটাবেস, লগ ফাইল, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দ্রুত সংরক্ষণ না করা হলে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাঁরা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগে নাম আসা কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক বিরত রাখারও দাবি জানিয়েছেন।

সূত্র বলছে, সাবিনা ইয়াসমিন (দাগ নং ৪৩৫৯২, তুষারধারা, গ্রাহক নং-৩৫৮৫০১৫৫, বিল নং-৫১৫৯২৯৩)-এর ৮০ কিলোওয়াট এবং আরেকটি অ্যাকাউন্টে (গ্রাহক নং-৩৫৭৯০৯৭৬) ১৮ কিলোওয়াটসহ মোট ৯৮ কিলোওয়াট লোড থাকা সত্ত্বেও ভবনটিতে দুটি সার্ভিস দিয়ে, নিচে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক থাকা অবস্থায় ৯ তলা ভবনে এইচটি সংযোগের পরিবর্তে ১৪ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এলটি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে।

এ ছাড়া, মেসার্স রহমান রাবার অ্যান্ড টায়ার (দাগ নং ১৬৯১, জনতাবাগ, রায়েরবাগ, গ্রাহক নং-২২৭৫০০৮৮)-এ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে মিটার পরিবর্তন হলেও বিল করা হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। এই সময়ে একটি ডুপ্লিকেট মিটার দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়।

সুলতানা রাজিয়া (স্বামীবাগ, কদমতলি, গ্রাহক নং-৪৩৬০৩৩৮৫)-এর ৮ম তলা ভবনের পূর্বের নির্মাণ মিটারটি রিডিংসহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং নতুন একটি মিটার স্থাপন করা হয়েছে (গ্রাহক নং-৩৫৫০০৯১০, বিল নং-৩৪৭৫০৮০)। তুষারধারা লক্ষ্মীপুর টাওয়ার-সংলগ্ন গ্রাহক (গ্রাহক নং-৩৫৮৫৭১৮)-এর ক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এইচটি গ্রাহককে এলটি গ্রাহকে রূপান্তর করা হয়েছে এবং প্ল্যানের বাইরে ৮টি অতিরিক্ত মিটার প্রদান করা হয়েছে।

সেকান্দার আলী (দাগ নং ৯২০৭, পলাশপুর)-এর ১০ তলা ভবনেও এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ নুরুজ্জামান হাওলাদার (আরএস ৪২৭, তুষারধারা)-এর ১০ তলা ভবনে এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ প্রদান করা হয় এবং পূর্বের নির্মাণ মিটারটি রিডিংসহ অপসারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া, সোলার ও পিএফআইবিহীন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। মাতুয়াইল ডগাইর নূর মসজিদের পেছনে একটি কয়েল কারখানার ক্ষেত্রে ব্যাংক ডিপোজিট ছাড়াই এলটি পোল উত্তর পাশ থেকে দক্ষিণ পাশে স্থানান্তর করা হয়েছে। আনোয়ার প্লাস্টিক, ওলামা নগর, ডগাইরে ১২ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং সোলারবিহীন সংযোগ প্রদান করা হয়েছে

মেসার্স বিএলসি টোল রুম অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (দাগ নং ৫৩, মেডিকেল রোড, গ্রাহক নং-৩৫৫০০৯১০, বিল নং-৩৫৯৮৯৪৬, লোড-৪৮ কিলোওয়াট)-এ সোলার ও পিএফআই ছাড়া সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং অন্য একটি ডিভিশন থেকে ৩ পিন মিটার এনে স্থাপন করা হয়েছে (মিটার নং-০২০৪৩০০০৪৯২৬)।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘুষ বাণিজ্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও নারীঘটিত নানা সমস্যায় জড়িত। আবুল বাশার তালুকদার শ্যামপুরে এক নারী দালালের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের ঘটনায় হাতেনাতে ধরা পড়ে বিয়ে করতে বাধ্য হন। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে মো. মঞ্জুরুল কাদেরের বিরুদ্ধেও; তিনিও একাধিক বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন।

এ ছাড়া, তিনি নিজেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার সামসুল হক টুকুর ভাতিজা পরিচয় দিয়ে কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুতল ভবনে উচ্চ ক্ষমতার এইচটি সংযোগ দেওয়ার পরিবর্তে বিপুল অঙ্কের ঘুষ নিয়ে এলটি সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ বিদ্যুৎ ঝুঁকি।

একাধিক প্রতিষ্ঠানে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার করে মাসের পর মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হলেও বিল প্রদানে গড়িমসি ও কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো মিটার সরিয়ে ফেলে নতুন মিটার স্থাপন করে পূর্বের ব্যবহার গোপন করা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সোলার সিস্টেম ও পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (পিএফআই) ছাড়াই সংযোগ প্রদান করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এমনকি অন্য ডিভিশন থেকে মিটার এনে সংযোগ দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের ঘটনাও ঘটেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্বে নানা অনিয়মের অভিযোগে বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে তাঁরা পুনরায় একই কর্মস্থলে ফিরে এসে আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

স্থানীয়দের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রত্যক্ষ মদদেই এই সিন্ডিকেট অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল বদলি হলেও তাঁর বলয় রয়ে গেছে। দুর্নীতির পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির অভিযোগও রয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে।

এ অবস্থায় স্থানীয় ভুক্তভোগীরা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এখনই ব্যবস্থা না নিলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটি দুর্নীতির জালে আটকে পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হানিফ উদ্দিন স্যারের নির্দেশের বাইরে কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ স্যার টাকা ছাড়া কিছু বোঝেন না। বাশার-মঞ্জুলের সিন্ডিকেটের বাইরে গিয়ে কেউ কাজ করতে পারে না। তাঁদের সঙ্গে চুক্তি করলেই মিলে সংযোগ। তাছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া কঠিন।’

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, ‘আমি নির্দোষ। এই ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল স্যারের নির্দেশের বাইরে কিছু করা সম্ভব নয়। তাঁর সিন্ডিকেটে সদস্য ছিলেন মঞ্জুরুল কাদের। আমি ছিলাম না। আর মাতুয়াইল ডিভিশনের অনিয়মের কারিগর হিসেবে যদি কাউকে বলেন, সে হচ্ছে ফিরোজ শেখ। তিনিই নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল স্যারের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার।’

অভিযুক্ত ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘আমি কোনো অনিয়ম করিনি কিংবা কোনো ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নই।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *