চট্টগ্রাম কারাগারে ‘মুক্তি বাণিজ্যর’ অভিযোগ ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

উচ্চ কিংবা নিম্ন আদালত—আইনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জামিনের স্পষ্ট নির্দেশ আসার পর নিয়ম মেনে জামিননামা পৌঁছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের হাতে। কারাবিধি ও দেশের সংবিধান অনুযায়ী জামিননামা পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, বিলম্ব এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন।
অভিযোগ রয়েছে, আদালতের জামিন আদেশ ও জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পরও কোনো কোনো বন্দিকে নির্ধারিত সময়ে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বিপরীতে অর্থের বিনিময়ে দ্রুত মুক্তি, নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ভয়, পছন্দের ওয়ার্ডে থাকার সুবিধা, কারা হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা এবং স্বজনদের সাক্ষাৎ ও পার্সেল ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একটি অনিয়মের চক্র গড়ে উঠেছে। গত দুই বছরে এসব অভিযোগ ঘিরে একের পর এক ঘটনা সামনে এলেও কারা প্রশাসনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আদালতের শোকজ নোটিশ পাওয়ার ঘটনায় ইকবাল হোসেনের দায়িত্ব ও ভূমিকা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট জামিন আদেশ থাকা সত্ত্বেও চকবাজার থানার একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলার আসামি এবং ওমর গণি এমইএস বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াছ হোসেনকে মুক্তি না দেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনের কাছে লিখিত জবাব চেয়েছেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কোতোয়ালি থানার একটি মামলায় গত ৭ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান ইলিয়াছ হোসেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টার দিকে তার জামিননামা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে নতুন কোনো প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট বা পুরোনো কাস্টডি ওয়ারেন্ট না থাকার পরও তাকে আটকে রাখার ঘটনায় আদালত গত ১৭ সেপ্টেম্বর সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনকে শোকজ করেন এবং সশরীরে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরবর্তীতে ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে জানা যায়, ইকবাল হোসেন ওই ঘটনায় আদালতে লিখিত জবাব দাখিল করেছেন।
এর আগেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ও চট্টগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী মানশ দাস চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেন, জেলার সাইয়েদ শাহ শরীফ, ডেপুটি জেলার মো. রাকিব শেখ ও তৌহিদুল ইসলামকে ‘ন্যায়বিচার দাবি নোটিশ’ বা Demand of Justice Notice পাঠান।
আইনি নোটিশে রাউজান থানার বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত বন্দি মোহাম্মদ শফিকে জামিন পাওয়ার পরও বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সেশন জজ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর ৫ এপ্রিল দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে জামিন বন্ড দাখিল করা হয়। আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং কোনো ওয়ারেন্ট না থাকা সত্ত্বেও তাকে পরদিন ৬ এপ্রিল বিকেল ৪টা ১০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২৫ ঘণ্টা আটক রাখা হয়। পরে নতুন একটি মামলায় প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট পৌঁছালে তাকে পুনরায় আটক দেখানো হয়। আইনজীবীর অভিযোগ, এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং আদালত অবমাননার শামিল।
চট্টগ্রাম কারাগারে জামিনের পর মুক্তি বিলম্বিত করা নিয়ে অভিযোগ শুধু ইলিয়াছ হোসেন বা মোহাম্মদ শফির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে অস্ত্র মামলার আসামি তৌহিদুল ইসলাম মামুন জামিন পান। অভিযোগ রয়েছে, জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পর সিনিয়র জেল সুপার ও জেলারকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে ডেপুটি জেলার তৌহিদ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তাকে আটকে রাখা হয় এবং পরে নতুন নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীর্ঘ সময় জামিনের পরও ছেলেকে আটকে রাখার খবর পেয়ে মামুনের বাবা আইয়ুব আলী হৃদরোগে আক্রান্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ঘনিষ্ঠ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নির্বাহী সদস্য আবু সাদাত মো. সায়েমের মুক্তি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ ওঠে। অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের প্রায় নয় মাস পর বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাকে নীরবে মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার পর ডেপুটি জেলার নওশাদ মিয়াকে স্ট্যান্ড রিলিজ বা বদলি করা হলেও অভিযোগ অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম কারাগার ঘিরে আরও অভিযোগ রয়েছে—বন্দিদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে জামিনের পর দ্রুত মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। বাঁশখালীর এক আওয়ামী লীগ নেতার ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা নেওয়ার পর জামিননামা পৌঁছানোর মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে মুক্তির অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে এক আইনজীবী এক লাখ টাকা দেওয়ার পর মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে কারাগার থেকে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মিরসরাইয়ের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিনের পাঁচটি মামলায় জামিন হওয়ার পর নতুন মামলায় না জড়ানোর শর্তে পাঁচ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে রাঙ্গুনিয়ার নাসির উদ্দিন রিয়াজের কাছ থেকে তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হলেও কোতোয়ালি থানাকে ‘ম্যানেজ’ করতে না পারায় ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে সংগৃহীত টাকা ফেরত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।এসব ঘটনায় কারাগারের ভেতরের ওয়ার্ড বরাদ্দ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ বন্দিদের স্যাঁতসেঁতে, গাদাগাদি পরিবেশে রাখলেও অর্থ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য ফ্যান, আলো-বাতাসযুক্ত ভালো ওয়ার্ড বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক বন্দিদের অভিযোগ, যমুনা-৮ নম্বর ওয়ার্ডকে একসময় অঘোষিত ‘আওয়ামী লীগ অফিসে’ পরিণত করা হয়েছিল।
কারাগারের ভেতরে প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য আলাদা কক্ষ, মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ, বিশেষ ফেরিওয়ালা এবং অনুগত বন্দিদের ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের ‘ওয়ার্ড মাস্টার’ পদটিও কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থের বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
কারা হাসপাতাল নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে হাসপাতালের বেড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে বাইরের রেস্টুরেন্টের খাবার, দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের সুবিধাসহ এমন কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, যা সাধারণ বন্দিদের নাগালের বাইরে বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক বন্দিরা।
বন্দিদের স্বজনদের সাক্ষাৎ নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়মে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে ঘুষ না দিলে স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বিপরীতে অর্থ দিলে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগ মেলে। বাইরে থেকে খাবার, ওষুধ ও পোশাক পাঠানোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কারাগারের এসব অনিয়ম বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। জামিনপ্রাপ্ত বন্দিকে মুক্তি দেওয়া, ওয়ার্ড বরাদ্দ, কারা হাসপাতাল, সাক্ষাৎ এবং পার্সেল—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কারা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভূমিকা থাকায় এসব অভিযোগ থেকে সিনিয়র জেল সুপার দায় এড়াতে পারেন না বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
বারবার বিতর্ক ও আদালতের অসন্তোষের মধ্যেও সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ইলিয়াছ হোসেনকে আটকে রাখার ঘটনায় আদালতের শোকজের বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, নথিপত্রে প্রযুক্তিগত বা প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এমনটি হয়ে থাকতে পারে এবং এতে কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।
তবে আইনজীবীদের একটি অংশের বক্তব্য, জামিনের পর কোনো বৈধ ওয়ারেন্ট না থাকা অবস্থায় বন্দিকে আটকে রাখা গুরুতর বিষয়। প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই বা নথিগত জটিলতার অজুহাতে আদালতের আদেশ কার্যকর না করা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ইকবাল হোসেনকে সিনিয়র তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পদায়ন করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দায়িত্ব পালন করছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের মুক্তি বিলম্বিত করা, আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন, ঘুষ লেনদেন, ওয়ার্ড বরাদ্দ, কারা হাসপাতাল, সাক্ষাৎ এবং পার্সেল ব্যবস্থাকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় চট্টগ্রাম কারা প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *