মক্কা জোট কি শুধুই কাগুজে? তুরস্ক-পাকিস্তানের নীরবতা ঘিরে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক ডেক্স :

সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলার পরও  তুরস্ক ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ না আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে। গত মাসে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব চুক্তিতে সই করার পরপরই এই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

বিশেষ করে সৌদির জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক এলাকায় হুথিদের হামলার পর প্রশ্ন ওঠে—চুক্তি অনুযায়ী তুরস্ক কি সৌদি আরবের পাশে সামরিকভাবে দাঁড়াবে?

তবে তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, এখনই জোটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। তার দাবি, চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা এখনো আইনগতভাবে কার্যকর হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা  বলে,  চুক্তিটি তিন দেশের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপরই এর প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা কার্যকর হবে।

তিনি জানান, তুরস্ক শিগগিরই চুক্তিটি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবে। সম্ভাব্যভাবে অক্টোবরেই এর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া দেশটির প্রেসিডেন্ট কোনো নিরাপত্তা চুক্তি অনুমোদন করতে পারেন না। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে সৌদি আরব রাজকীয় ডিক্রির মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারে।

ফলে এখনই তুরস্ককে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জন্য দায়ী করা আইনগতভাবে সঠিক নয় বলে মনে করেন ওই কর্মকর্তা।

তুর্কি কর্মকর্তা বলেন, মক্কা চুক্তি শুধু একটি নিরাপত্তা জোট নয়; বরং এটিকে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তার ভাষায়, চুক্তিটি খুব সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে এবং এর পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রকাশ হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও তিন দেশকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—

– সম্ভাব্য হুমকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা;

– তিন দেশের মধ্যে নিয়মিত পরামর্শ ও সমন্বয়;

– যৌথ প্রতিরক্ষা ও প্রস্তুতি পরিকল্পনা;

– সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বা **ইন্টারঅপারেবিলিটি** তৈরি;

– দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা।

তুর্কি কর্মকর্তার মতে, এসব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েক বছরও সময় লাগতে পারে।

তিন দেশ একসঙ্গে সামরিক মহড়াই করেনি

তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব এর আগে আলাদাভাবে একে অপরের সঙ্গে সামরিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। কিন্তু তিন দেশকে নিয়ে একসঙ্গে কোনো ত্রিপক্ষীয় সামরিক মহড়া এখনো হয়নি।

তাই চুক্তি সই করলেই তিন দেশের বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে একসঙ্গে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে জোটের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিন দেশ সৌদি আরবে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতে তিন বছরের জন্য একজন পাকিস্তানি মহাসচিব এই দায়িত্ব পালন করবেন।

ন্যাটোর মতো হলেও হামলা মানেই পালটা

মক্কা চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে চুক্তিটিকে প্রায়ই ন্যাটোর আর্টিকেল ৫- এর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

তুর্কি কর্মকর্তা জানান, চুক্তি তৈরির সময় ন্যাটোর চুক্তি থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে।

তবে ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর মতো এখানেও কোনো সদস্য আক্রান্ত হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পালটা  হামলা চালানোর বাধ্যবাধকতা নেই। বরং আক্রান্ত দেশ সহযোগিতা চাইলে সদস্যরা আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে।

অর্থাৎ, হামলা হলেই সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হবে—এমন কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চুক্তিতে নেই।

সৌদির পাশে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক-পাকিস্তান

সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর তুরস্ক ও পাকিস্তান রাজনৈতিকভাবে রিয়াদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

পাকিস্তান জানিয়েছে, সৌদির সঙ্গে তাদের আলাদা একটি বাধ্যতামূলক দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেও রিয়াদ এখনো তাদের সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানায়নি।

তুর্কি কর্মকর্তাও প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতে ন্যাটোর সদস্যদের আকাশসীমায় রুশ ড্রোন প্রবেশের ঘটনায় জোট সবসময় সামরিক পালটা ব্যবস্থা নিয়েছে কি না।

তুর্কি কর্মকর্তার মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূল উদ্দেশ্য কোনো একটি হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়া নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার ঝুঁকি কমে।

তিনি স্বীকার করেন, হুথিদের সৌদি আরবের ওপর হামলা এবং ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সম্ভাবনা এই জোটের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে তার দাবি, এই চুক্তি করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে তিন দেশের মধ্যে এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যা উত্তেজনা কমাতে এবং সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *