নিজস্ব প্রতিবেদক:
চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন ও সংস্কারকাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া, কাজ শেষ না করেই বিল পরিশোধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, তাঁর ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন যাচাই এবং সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের জোর দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ অভিযোগকারীরা ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের একাংশ।
অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ-১-এর আওতাধীন বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার উন্নয়ন ও সংস্কারকাজে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট। এই চক্রের মাধ্যমে দরপত্রের প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবিত করে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কাজের বাস্তব অগ্রগতি ও গুণগত মান কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই না করেই সরকারি অর্থ পরিশোধের পুরো ব্যবস্থা পাকা করা হয়।
দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। বিভিন্ন প্রকল্পের শর্ত, কারিগরি মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশগুলো যথাযথ নিয়মে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পাশ কাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম দর প্রস্তাব করা যোগ্য প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় বেশি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় এবং দরপত্রের স্বচ্ছতা মারাত্মভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এসব অনিয়মের অন্যতম একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন স্থাপনার সংস্কার ও মেরামতকাজের ঘটনা। ভবনের দরজা-জানালা মেরামত, বহিরাংশের প্লাস্টার, অভ্যন্তরীণ রং এবং সিভিল ও স্যানিটারি সংস্কারের এই কাজের জন্য সরকারি প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। দরপত্রে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কম দর প্রস্তাব করলেও, একটি প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি দর প্রস্তাব করার পরও তাঁদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কাজের গুণগত মান বা প্রকৃত অগ্রগতি যাচাই না করেই এমন বিল পরিশোধের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এই পুরো দুর্নীতির জালে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের পাশাপাশি আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিয়াদুন উন নবী, সহকারী প্রকৌশলী ফরহান শাহরিয়ার এবং উপসহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম। এই কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই মূলত দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প তদারকি এবং ভুয়া বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন হতো। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কাজের মান যাচাইয়ে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে শৈথিল্য দেখাতেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাদার বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম রাজুসহ বেশ কয়েকজন ঠিকাদার প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে, গণপূর্ত বিভাগের কার্যক্রমে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা প্রতিযোগিতার পরিবেশ পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে একচ্ছত্র সুবিধা দেওয়ার ফলে যোগ্য ঠিকাদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং কাজের বাস্তবায়ন ও বিল পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়মের পাহাড় জমছে।
সরকারি দায়িত্ব পালনের আড়ালে মোহাম্মদ জাকির হোসেন নিজে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নিজের ব্যবহারের জন্য প্রায় এক কোটি টাকার একটি এবং পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের জন্য প্রায় ৯০ লাখ টাকার আরেকটি গাড়ি রয়েছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংকে তাঁর নিজের নামে ১০টি এবং স্ত্রীর নামে ৬টি এফডিআরসহ ছেলে-মেয়ে ও নিকটাত্মীয়দের নামে ১৫টি সঞ্চয়পত্র থাকার বিস্ফোরক তথ্য জানানো হয়েছে। এমনকি তাঁর ও পরিবারের পাশাপাশি শ্বশুরবাড়ির নিকটাত্মীয়দের নামেও বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বেনামি হিসাব ও সম্পদ রয়েছে, যার বৈধ উৎস নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। এর বাইরে তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া প্রকল্প তৈরি করে সরকারি বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও করা হয়েছে।
এই দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ, দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রস্তাব, কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, চুক্তিপত্র, মাপবই বা মেজারমেন্ট বুক, কাজ সম্পন্নের সনদ, বিল-ভাউচার, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং অর্থ ছাড়ের নথি গভীরভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, প্রকৌশলীদের সঙ্গে তাদের ব্যবসায়িক যোগসূত্র এবং সরকারি অর্থের চূড়ান্ত ব্যবহার নিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে।
এর আগেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না আসায় অভিযোগকারীরা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা অবিলম্বে জাকির হোসেনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং পারিবারিক আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখতে দুদকের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে দ্রুত তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা না হলে সচেতন নাগরিক সমাজ ও সম্মিলিত ঠিকাদারি সংগঠনের পক্ষ থেকে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সামনে কঠোর মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এদিকে এসব অভিযোগের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাকির হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।