চন্দনাইশ পৌরসভার প্রকৌশলী রাজীবের বিরুদ্ধে ৩০ শতাংশ কমিশন ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক :

চন্দনাইশ পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েমের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

২০১৭ সালে বান্দরবান পৌরসভায় নকশাকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও চন্দনাইশ পৌরসভায় বদলির পর থেকেই তাঁর সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতায় পৌরসভার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকাজ আজ স্থবির।

চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাঁর সময়কার সব প্রকল্পের ফাইল তলব ও তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও বহাল তবিয়তে বহাল আছেন এই প্রকৌশলী।

‘সব ম্যানেজ করেই তো খাই’: রাজীবের ঘুষ সাম্রাজ্য

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সাব-ঠিকাদারদের বিস্ফোরক তথ্য অনুযায়ী, চন্দনাইশ পৌরসভার প্রতিটি কাজের বিল ছাড় করাতে ও সাইট পরিদর্শনে রয়েছে রাজীব মজুমদারের নির্দিষ্ট রেট।

ঠিকাদার মো. তসলিম উদ্দীনের অভিযোগ, প্রতিটি কাজের বিপরীতে রাজীব মজুমদার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন হাতিয়ে নেন। চন্দনাইশ হাসপাতালের গেট থেকেই তিনি আদায় করেছেন ৯০ হাজার টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, কোনো সাইটে একবার পরিদর্শনে গেলেই ঠিকাদারকে নগদ ৪ হাজার টাকা ‘পরিদর্শন ফি’ দিতে হয়, নথিপত্র বা বিল আটকে দেওয়া হয়।

এমনকি সব দাবি পূরণের পরও চূড়ান্ত বিলের বিপরীতে অতিরিক্ত ৬ শতাংশ কমিশন দাবি করেন তিনি।

ইমারত নির্মাণ থেকে জনস্বাস্থ্য-সর্বত্রই দুর্নীতির থাবা

ইমারত নির্মাণে ঘুষ বাণিজ্য: স্থানীয় বাসিন্দা ও এলডিপি পৌরসভা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকতার উদ্দীনের দায়ের করা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিয়মবহির্ভূতভাবে ইমারত নির্মাণ অনুমোদন কমিটি উপেক্ষা করে সরাসরি ফাইল অনুমোদনের কথা বলে আবদুল শুক্কুরের কাছ থেকে ৩৮ হাজার, হামিদুল্লাহ সিকদারের কাছ থেকে ৪৫ হাজার এবং শাহা আলমের কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকাসহ অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েও ভবন অনুমোদন না দিয়ে হয়রানি করেছেন পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদার।

পানি সরবরাহ ও ল্যাট্রিন দুর্নীতি: জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহ লাইনে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার ও নকশার অর্ধেক গভীরে পাইপ বসিয়ে মাটি ভরাটের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে পৌরসভার উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে।

অনেক স্থানে পাইপ না বসিয়েই সম্পূর্ণ বিল উত্তোলনের তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদনহীনভাবে প্রায় ৮০০টি পিট ল্যাট্রিনের তালিকা তৈরি করে টয়লেট নির্মাণ ছাড়াই অর্থ আত্মসাৎ করার সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

অডিটে ২১ লাখ টাকার সরকারি ক্ষতি: ২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত অডিটে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (২য় পর্যায়) অধীনে বিসি রাস্তার ব্রিক ওয়ালে অতিরিক্ত বিল প্রদান এবং আর্থ ফিলিংয়ে বক্স কাটিংয়ের মাটি কর্তন না দেখিয়ে সরকারের ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৬১০ টাকা আর্থিক ক্ষতিসাধন প্রমাণিত হয়েছে।

অতিরিক্ত দায়িত্বের অপব্যবহার ও জনদুর্ভোগ চরমে

পৌরসভার সচিবের শূন্যপদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সুবাদে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের মাধ্যমে ১০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে রাজীব মজুমদারের বিরুদ্ধে।

পর্যাপ্ত পুঁজি ও তদারকি না থাকায় দুলারপাড়া-দুর্লভপাড়া এলাকার কাজগুলো ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে গাছবাড়ীয়া খাঁনহাট থেকে আব্দুল বারী হাট পর্যন্ত সড়কের দুর্লভপাড়া বটতল এলাকার পুকুরপাড়ের কাজ ‘নিপা এন্টারপ্রাইজ’ ফেলে রাখায় তা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে প্রতিদিন হাজারো সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। ১২০ কোটি টাকার পানি শোধনাগার প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও পৌরবাসী নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না।

দুদক ও দপ্তরে অভিযোগ করা হলেও প্রভাবশালী এই প্রকৌশলী তা ম্যানেজ করে ধামাচাপা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক মোছাম্মৎ রাশেদা আক্তারের স্বাক্ষরিত স্মারকে সুনির্দিষ্ট তদন্ত ও ফাইল তলবের নির্দেশ দেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে এখনও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

এ বিষয়ে রাজীব মজুমদারের সঙ্গে মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে পৌরবাসীর জনদুর্ভোগ লাঘব করা হোক।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *