নিজস্ব প্রতিবেদক:
ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং ১৭৪ পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগের মুখে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমকে ওএসডি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই বদলির আদেশ দেওয়া হয়। উপসচিব জেসী দত্ত স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, জনস্বার্থে জারিকৃত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক নথিপত্র গায়েব হওয়ার ঘটনায় যখন দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে এবং সংবাদমাধ্যমে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই একজন শীর্ষস্থানীয় সচিবের এই আকস্মিক বদলি প্রশাসনিক মহলে গভীর কৌতূহল ও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময় দেশজুড়ে বাস্তবায়িত ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিতে প্রায় ২৯২ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক অনিয়ম এবং সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যাপক স্বজনপ্রীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই কর্মসূচির নানা অসংগতি ও দুর্নীতির গোমর ফাঁস করতে গিয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তরে পাঠানো প্রায় ১৭৪ পৃষ্ঠার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তদন্ত প্রতিবেদন রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। ওই প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কঠোর প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিবর্তে মূল তদন্ত প্রতিবেদনটিই সচিবের দপ্তর থেকে উধাও হয়ে যাওয়ায় গোটা প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করে যখন এই অনুসন্ধানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ডিডি রোকন উদ্দিন খানের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে তাকে নানাভাবে হয়রানি করার গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। অপরাধ তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই পুরো কেলেঙ্কারির নেপথ্যে কারা জড়িত এবং কেনই বা রাষ্ট্রীয় অর্থের এমন নয় বছর ধরে লোপাট হলো, তা উদ্ঘাটনে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় অতীতে পরিচালিত তদন্তগুলোর নথিপত্র নতুন করে তল্লাশি করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতীতে কোনো নির্দিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে তার ভিত্তিতে কেন কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই চাঞ্চল্যকর বদলি ও আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় প্রশাসনের অভ্যন্তরে এবং সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকা অবস্থায় এমন বড় ধরনের দুর্নীতি ও নথি গায়েবের অভিযোগ ওঠার পর দায়িত্বশীল পদে থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত বা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত দুরূহ। দুর্নীতি দমন ও সুশাসন নিশ্চিতের দাবিদার বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল বদলি বা ওএসডি করার মাধ্যমেই এই অপরাধের দায়মুক্তি মিলতে পারে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচারিক বা প্রশাসনিক তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৭৪ পৃষ্ঠার নিখোঁজ প্রতিবেদনটি উদ্ধার এবং এর পেছনে থাকা প্রকৃত কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে অভিযুক্ত সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সরকারি ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা সত্ত্বেও তাঁকে পাওয়া যায়নি এবং তাঁর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রশাসনিক স্বাভাবিক কার্যক্রম গতিশীল রাখার স্বার্থেই এই বদলি করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে।
ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি মূলত দেশের বেকার যুবকদের দক্ষ করে তোলার জন্য এবং তাদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একটি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ত্রুটি, তদারকির অভাব এবং একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির কারণে এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এখন বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে। প্রায় ২৯২ কোটি টাকার এই অপচয় কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারই নয়, বরং সাধারণ মানুষের আস্থার ওপর এক মারাত্মক আঘাত। অতীতে এ ধরনের বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে প্রশাসনিক উদাসীনতা দেখা গেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমনে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর জবাবদিহিতার বিকল্প নেই।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৭৪ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কোনো সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, বরং এটি পরিকল্পিত একটি অপরাধ হতে পারে। তাই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে না। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও যদি এ ধরনের গুরুতর দুর্নীতির সুরাহা না হয়, তবে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলেই মনে করছেন সচেতন মহল