ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যায় এমপির ছেলে রিমান্ডে, নেপথ্যে কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় নাটোর-৪ আসনের বিএনপি দলীয় এমপি আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, এমপির দুই ছেলের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ।

১৪ অক্টোবর সন্ত্রাসী হামলায় গুরুতর আহত নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শাকিল ইসলাম (২৩) মারা যান। সোমবার রাত সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। শাকিল গুরুদাসপুর উপজেলা সদরের কাছারিপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। এ ঘটনায় স্থানীয় এমপি আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকালে তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বিচারক ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে শাকিলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান মিন্টুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপজেলার ধারাবারিষা গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে আটক করে জেলা ডিবি কার্যালয়ে নেয়। এর আগে ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম বাদী হয়ে গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাত ৮-১০ জনকে আসামি করে এজাহার দায়ের করেন।

স্থানীয় কয়েকজন জানান, শাকিল এমপি আবদুল আজিজের ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। এমপির দুই ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু ও মাহমুদুজ্জামান সোহাগের পৃথক অনুসারী ও সমর্থক গোষ্ঠী আছে। দুই ভাইয়ের অনুসারীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব আছে। তাদের দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে শাকিলের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর থেকে ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক আইডিতে তার দেওয়া একটি পোস্ট ভাইরাল হয়। যেখানে তিনি নিজের জীবন নিয়ে সংশয়ে আছেন জানিয়ে লেখেন-‘আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এ বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে একটি জিডি করেছি। জিডিতে তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়, তাহলে ওই ডায়েরি অনুযায়ী মামলা করে দিবেন।’ এ পোস্ট ছড়িয়ে পড়ার পর, কে সেই বড় ভাই-সেটা জানতে জনসাধারণের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

নিহত শাকিলের বাবা রবিউল করিম বলেন, ‘আমার ছেলের ওপর হামলার পর নেতাদের কোনো ভূমিকাই দেখিনি। হামলার ১৪ দিনেও কোনো আসামি গ্রেফতার হয়নি। আমি ছেলে হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই।’

স্থানীয় ও থানা সূত্রে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে চাঁচকৈড় বাজার থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন শাকিল। নূর একাডেমির সামনে পৌঁছলে শাকিলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে হেলমেট পড়া দুই যুবক। বাঁচতে শাকিল দৌড় দেন। এ সময় মোটরসাইকেল নিয়ে ধাওয়া দেয় তারা। শহিদা জলিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে শাকিলকে তারা ধরে ফেলে এবং চাপাতি ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। স্থানীয়রা তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালে নেওয়া হয়। ১২ দিন পর সোমবার রাত ৮টার দিকে ওই হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

শাকিলের মৃত্যুর খবর শুনে মঙ্গলবার সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা হাসপাতালে যান। দুপুর ২টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শাকিলের প্রথম জানাজা হয়। সেখান থেকে রাত ৮টার দিকে লাশ গুরুদাসপুর পৌঁছে। এরপর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পুরানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

এদিকে শাকিলের মৃত্যুতে গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম এখন শোকাচ্ছন্ন। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ-সদস্য মো. আব্দুল আজিজ। এ সময় তিনি বলেন-‘হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি অবলোকন করেছি। শাকিলের চিকিৎসার যত খরচাদি লাগে দিয়েছি। কিন্তু সে মারা যাবে-এ ধারণা ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওসিকে মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে বলেছি। অপরাধী আমার সন্তান হোক আর যেই হোক, যদি প্রকৃত সাক্ষ্যপ্রমাণে দোষী হয় তাকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’

গুরুদাসপুর থানার ওসি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল করিম থানায় মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮-১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেফতারসহ অন্য আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না। দ্রুত সব আসামি গ্রেফতার হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতে খায়ের আলম জানান, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যা মামলায় নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখিয়ে গুরুদাসপুর আমলি আদালতে হাজির করে ১০ দিন রিমান্ড আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে বিচারক তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *