অনিয়মের নেপথ্যে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ঢাকা ওয়াসায় ক্যাটাগরি পরিবর্তনের নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আবাসিক ও বাণিজ্যিক শ্রেণির পানি সরবরাহের বিলিং ক্যাটাগরি পরিবর্তনের নামে ঢাকা ওয়াসার রাজস্ব বিভাগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঘুষের বিনিময়ে ক্যাটাগরি পরিবর্তন করা হচ্ছে, আর দাবি করা টাকা না দিলে পুনরায় উচ্চ হারে বিল চাপিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করা হচ্ছে। প্রায় এক হাজার গ্রাহকের সংযোগ নিয়ে এভাবে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে ওয়াসার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এতে একদিকে গ্রাহকরা চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকার শত কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে এই চক্রের মূল হোতা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (সিআরও) মো. আনোয়ার হোসেনের নাম। তার প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় ও নেতৃত্বে এই অবৈধ লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে। এতে সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন রাজস্ব কর্মকর্তা সাধন চন্দ্র দাস এবং জোন-১ এর কম্পিউটার অপারেটর মাহাদী।

এক ভুক্তভোগী গ্রাহকের অভিজ্ঞতা থেকে এই অনিয়মের রূপ সামনে এসেছে। তিনি জানান, তার পানির সংযোগটি দীর্ঘদিন বাণিজ্যিক শ্রেণিতে থাকার পর আবাসিক ক্যাটাগরিতে পরিবর্তনের জন্য সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা এক লাখ টাকা নেন। টাকা পরিশোধের পর ২০২৬ সালের জুলাই মাস থেকে বিল আবাসিক হিসেবে আসলেও, কোনো প্রকার আবেদন ছাড়াই আগস্ট মাসে এটি আবার বাণিজ্যিক ক্যাটাগরিতে পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে যোগাযোগ করা হলে পুনরায় ক্যাটাগরি পরিবর্তনের জন্য তার কাছে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৯৬ অনুযায়ী ক্যাটাগরি পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট আবেদন, সরেজমিন তদন্ত, পূর্বের সকল বকেয়া পরিশোধ এবং প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তবে এসব আইনি প্রক্রিয়ার কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কোনো ধরনের মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই ছাড়াই কেবল কর্মকর্তাদের অনৈতিক চাহিদা মেটালেই রাতারাতি বদলে যাচ্ছে বিলিং ক্যাটাগরি।

ওয়াসার ভেতরের প্রক্রিয়ার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিলিং সহকারী জানান, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার নির্দেশে মাঠপর্যায়ের রাজস্ব পরিদর্শক ও বিলিং সহকারীরা সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে চুক্তিতে যান। চুক্তি অনুযায়ী সংগৃহীত অর্থ সিআরও’র মনোনীত রাজস্ব কর্মকর্তা সাধন চন্দ্র দাসের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অর্থ হাতে পাওয়ার পর সিআরও’র নিজস্ব আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কম্পিউটার অপারেটরের মাধ্যমে বিলিং সিস্টেমে ক্যাটাগরি পরিবর্তন করা হয় এবং দিনশেষে সম্পূর্ণ হিসাব প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ওয়াসার অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে এবং রাজস্ব ফাঁকি রোখে এখন সরকার ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহকরা।

এসব অনিয়ম ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঢাকা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তরের রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) সাধন চন্দ্র দাসের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের সমস্ত দাবি অস্বীকার করেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *