চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ কোটি টাকার কাজে ভয়ংকর জালিয়াতির অভিযোগ জি কে শামীমের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ষষ্ঠ একাডেমিক ভবন (দ্বিতীয় কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ) নির্মাণের ৭৫ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পেতে জালিয়াতি, ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার ও আইনি সত্তা গোপনের অভিযোগে আলোচিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়েরকৃত মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচারকার্য শুরু হয়েছে। অভিযোগ তদন্তের দীর্ঘ পথপরিক্রমা শেষে গত রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মো. মিজানুর রহমানের আদালত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চার্জগঠন বা বিচার শুরুর নির্দেশ প্রদান করেন। ঘটনার দীর্ঘ ১০ বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাওয়া এই আলোচিত মামলার প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ২০ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। মামলা চলাকালে জামিনে থাকা আসামি জি কে শামীম বিচারকের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আইনি প্রতিকার প্রার্থনা করেছেন।

মামলার নথি ও দুদকের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা স্পর্শকাতর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৭৫ কোটি ১ লাখ ২৯৫ টাকা প্রাক্কলিত মূল্যে একাডেমিক ভবনের দ্বিতীয় পর্যায় নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে। উক্ত প্রক্রিয়ায় জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান ‘জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড’ লিড ফার্ম এবং ‘দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড’ যৌথ অংশীদার হিসেবে দরপত্রে অংশ নিয়ে কার্যাদেশ বাগিয়ে নেয়। একই বছরের ১৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কার্যাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে দুদকের গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) দরপত্র আহ্বানের মাত্র একদিন পর অর্থাৎ ২৯ আগস্ট কোম্পানিটি নতুন নিবন্ধিত হলেও, কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ছাড়াই শামীমের আগের একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘এম/এস জি কে বিল্ডার্স’-এর গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা, পাঁচ বছরের বার্ষিক টার্নওভার ও লিকুইড অ্যাসেটের তথ্য জাল করে নথিপত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল।

তদন্তকারী সংস্থার দাখিলকৃত নথিপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে যৌথ মূলধনী কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্রে প্রকৃত আইনগত সত্তা গোপন করা হয়েছিল এবং অনুমোদিত শেয়ারের হিসাব কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করা হয়। তৎকালীন সময়ে মাত্র দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই বিপুল অঙ্কের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সাধারণ ঠিকাদারদের ফরম ক্রয়ে বাধা দেওয়া এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের দুটি পক্ষের মধ্যে ক্যাম্পাসে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের মেগা ক্যাসিনোবিরোধী র‍্যাবের অভিযানে নিকেতন থেকে বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও মাদকসহ জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই জালিয়াতির অন্ধকার রেকর্ড উন্মোচিত হতে শুরু করে।

দীর্ঘ আইনি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালের দরপত্র জালিয়াতির বিরুদ্ধে দুদক চার বছর অনুসন্ধানের পর ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৭ মে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র পেশ করা হয়। মামলায় প্রথমে দি বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরীকে অভিযুক্ত করা হলেও তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, ফলে জি কে শামীমই একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে চিহ্নিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম আদালতে দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. রেজাউল করিম রনি নিশ্চিত করেন যে, দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৭ (গুরুত্বপূর্ণ নথি জালকরণ), ৪৬৮ (প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি), ৪৭১ (জাল দলিল ব্যবহার) এবং ৪০৯ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ) ধারায় মামলাটির চার্জগঠন সম্পন্ন হয়েছে।

বাংলাদেশের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (PPA) ও বাংলাদেশ দণ্ডবিধির প্রাসঙ্গিক ধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় সংস্থায় ভুয়া তথ্য দিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও মিথ্যা অভিজ্ঞতা প্রদর্শন গুরুতর জামিন-অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যদি আইনি কাঠামো লঙ্ঘন করে জাল নথির সাহায্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের কাজ হাতিয়ে নেয়, তা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) অনুযায়ী সরাসরি কালো তালিকাভুক্ত ও শাস্তিযোগ্য অন্যায়। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ওপরই চূড়ান্ত শাস্তি নির্ভর করছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যগ্রহণ পাবলিক সেক্টরে ঠিকাদারি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় নজির হিসেবে কাজ করবে।

বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের অভিমত অনুযায়ী, দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানের অংশ নেওয়া এবং ভুয়া নথির মাধ্যমে ৭৫ কোটি টাকার দরপত্র অনুমোদনের এই ঘটনায় তৎকালীন দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নজরদারির চরম ঘাটতি উন্মোচিত হয়েছে। আগামীতে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত যদি অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করেন, তবে তা ভবিষ্যতের জন্য ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে এক মাইলফলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সততা ফেরাতে বিচারব্যবস্থার এই দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *